অর্থনৈতিক কার্যকলাপ মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ইসলামী জীবনদর্শনে, উপার্জন বা রিজিক সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি কেবল জাগতিক প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যম নয়। এটি একটি গভীর ঈমানী দায়িত্ব। একজন মুসলিমের জন্য তার আয়ের উৎস হালাল নাকি হারাম, তা তার ইহকাল ও পরকালের সফলতা নির্ধারণ করে।
জীবনে আয়ের উৎস কেন গুরুত্বপূর্ণ
আয়ের উৎস একটি মানুষের নৈতিক চরিত্র, মানসিক শান্তি এবং আধ্যাত্মিক সংযোগের মূল ভিত্তি। ইসলাম জোর দিয়ে বলে যে, অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ ব্যক্তিকে আল্লাহ্ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর হালাল উপায়ে উপার্জিত সম্পদ আল্লাহ্র নৈকট্য লাভে সহায়ক। এই পার্থক্যটি ভুলে যাওয়া বা উপেক্ষা করা সমাজের নৈতিক কাঠামোতে ফাটল ধরায়।
রিজিক শুধুমাত্র সম্পদ নয়, আল্লাহর নেয়ামত
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, রিজিক শব্দটির ব্যাপকতা শুধু অর্থ বা ভৌত সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুস্থতা, জ্ঞান, উপযুক্ত জীবনসঙ্গী, নেক সন্তান এবং সর্বোপরি মনের শান্তি সবই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দেওয়া রিজিক। হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে অন্যান্য রিজিকগুলোতেও আল্লাহ্ বরকত দান করেন।
হালাল-হারাম পার্থক্য না বোঝার ক্ষতিকর প্রভাব
যখন মানুষ উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার জীবন থেকে বরকত (কল্যাণ) উঠে যায়। ফলে সম্পদ বা প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও সে প্রকৃত সুখ ও শান্তি পায় না। এই অসচেতনতা শেষ পর্যন্ত তাকে আল্লাহ্র অসন্তুষ্টি এবং পরকালের কঠিন শাস্তির দিকে ঠেলে দেয়।
রিজিক কী?
ইসলামী পরিভাষায় রিজিকের অর্থ
রিজিক (আরবি: رِزْق) হলো আল্লাহ্ তা’আলা কর্তৃক তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখা এবং প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রদত্ত সমস্ত সুবিধা ও সরবরাহ। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাণীর রিজিক আল্লাহ্ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত এবং তিনি তাঁর সকল সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন।
রিজিকের বিভিন্ন ধরন
রিজিকের ধারণা বস্তুবাদীতার ঊর্ধ্বে:
- অর্থনৈতিক রিজিক: বেতন, ব্যবসার লাভ, সম্পত্তি ও সম্পদ।
- শারীরিক রিজিক: রোগমুক্ত জীবন, কর্মক্ষমতা এবং সুস্বাস্থ্য। এটি ইবাদতের জন্য অপরিহার্য।
- আধ্যাত্মিক রিজিক: ঈমানের দৃঢ়তা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, এবং আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের সুযোগ।
- সামাজিক রিজিক: উত্তম প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু এবং সমাজে সম্মান।
- পারিবারিক রিজিক: নেককার ও অনুগত সন্তান, দাম্পত্য সুখ এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতা।
হালাল রিজিক কী?
হালাল আয়ের সংজ্ঞা
এই হালাল রিজিক হলো এমন উপার্জন যা ইসলামী শরীয়াহর বিধান অনুযায়ী বৈধ, নৈতিক এবং স্বচ্ছ উপায়ে অর্জিত। এই আয়ের পদ্ধতিতে কোনো ধরনের সুদ, জুয়া, প্রতারণা, শোষণ, অন্যায় বা নিষিদ্ধ পণ্যের লেনদেন থাকতে পারবে না। হালাল আয়ের ভিত্তি হলো শ্রমের প্রতি সম্মান এবং চুক্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা।
কুরআন-হাদিসে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বারবার মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আহার করো সে সব পবিত্র বস্তু, যা আমরা তোমাদেরকে দিয়েছি এবং আল্লাহ্র শোকর আদায় করো, যদি তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করো।” (সূরা আল-বাকারা, ২: ১৭২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর পরিশ্রম করে হালাল রুজি অন্বেষণকে দ্বিতীয় ফরয হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি বলেছেন, “ফরয ইবাদতের পরে হালাল রুজি উপার্জন করাও একটি ফরয।” (বায়হাকী)
হালাল আয়ের পথসমূহ
- শ্রম ও মজুরি: ন্যায্যভাবে কাজ করে নির্ধারিত পারিশ্রমিক গ্রহণ।
- সৎ ব্যবসা: সততা, পণ্যের মান ও সঠিক ওজন নিশ্চিত করে করা ব্যবসা।
- কৃষি ও শিল্প: বৈধভাবে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মাধ্যমে আয়।
- মুদারাবা/মুশারাকা: ইসলামী অর্থায়নের নীতিমালা অনুসরণ করে লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগির ভিত্তিতে অংশীদারিত্বের ব্যবসা।
হারাম রিজিক কী?
সরাসরি নিষিদ্ধ আয়
সরাসরি নিষিদ্ধ বা কবীরা গুনাহের মাধ্যমে অর্জিত আয়:
- সুদ (রিবা): ঋণের উপর বা বিনিময়ের ক্ষেত্রে চুক্তির অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা। কুরআন এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
- জুয়া (মাইসির): যেখানে অনিশ্চিত লাভের জন্য অর্থ বাজি ধরা হয়।
- ঘুষ (রিশওয়াহ): অবৈধ বা অন্যায় কাজ সম্পন্ন করার জন্য অর্থ বা উপহার দেওয়া ও নেওয়া।
- চুরি ও ডাকাতি: অন্যের সম্পদ জোরপূর্বক বা গোপনে হরণ করা।
- নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা: মদ, মাদক, মানব পাচার, পশুর রক্ত বা মৃত প্রাণীর মাংসের ব্যবসা।
পরোক্ষভাবে হারাম আয়ের উৎস
যেসব আয় লেনদেনের স্বচ্ছতা বা নৈতিকতার অভাবে হারাম হয়ে যায়:
- ঠকানো: পণ্যের ত্রুটি গোপন করা বা ক্রেতাকে অন্ধকারে রেখে বিক্রি করা।
- অসৎ ওজন ও পরিমাপ: ওজনে কম দেওয়া বা পরিমাপে কারচুপি করা (মুতাফফিফীন)।
- মিথ্যা কসম ও হলফ: ব্যবসায়িক সুবিধা লাভের জন্য মিথ্যা শপথ করা।
- কাজে ফাঁকি দেওয়া: সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে দায়িত্বে অবহেলা করে পূর্ণ বেতন নেওয়া।
- একাচেটিয়া বাজার সৃষ্টি: কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া বা মজুদ করে রাখা।
হারাম রিজিকের ক্ষতি
হারাম রিজিক একজন ব্যক্তির জীবনের প্রতিটি স্তরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
দোয়া কবুল না হওয়া
রাসূল (সা.) এক ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন যিনি দূর পথ থেকে এসে আল্লাহ্র কাছে দুই হাত তুলে দোয়া করছেন, অথচ তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক সবই হারাম উপার্জন থেকে এসেছে। তখন তিনি বলেন, “তাহলে কিভাবে তার দোয়া কবুল হবে?” (সহীহ মুসলিম)
আমলের বরকত নষ্ট হওয়া
হারাম অর্থে গঠিত পরিবারে বা হারাম অর্থে কেনা খাদ্য গ্রহণ করে সম্পাদিত ইবাদত (সালাত, সাওম, হজ)-এর আধ্যাত্মিক গুণ ও বরকত নষ্ট হয়ে যায়।
পরিবারে অশান্তি বৃদ্ধি
হারাম সম্পদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে বিশৃঙ্খলা, অবিশ্বাস, কলহ ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে। কারণ আল্লাহ্র রহমত ও শান্তি সেই ঘর থেকে উঠে যায়।
সন্তানদের চরিত্রে নেতিবাচক প্রভাব
হারাম খাদ্য ও পরিবেশে লালিত-পালিত সন্তানদের মনে পাপের বীজ সহজে জন্মায়। তারা পিতা-মাতার অবাধ্য হয় এবং নৈতিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যায়।
আল্লাহর গজব ও শাস্তির ভয়
হারাম উপার্জনকারীরা দুনিয়ার জীবনে নানাবিধ বিপদ, অভাব ও অশান্তির শিকার হতে পারে। এটি আল্লাহ্র গজবের বহিঃপ্রকাশ।
মৃত্যুর পর কঠিন জবাবদিহি
কিয়ামতের দিন বান্দাকে চারটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো: “সে তার সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।” হারাম উপার্জনের জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
হালাল আয়ের গুরুত্ব
ইবাদত কবুল হওয়ার মাধ্যম
হালাল উপার্জনের অর্থ দিয়ে খাদ্য গ্রহণ করলে শরীর পবিত্র থাকে এবং এই পবিত্রতার কারণে ইবাদতসমূহ আল্লাহ্র কাছে সহজে গৃহীত হয়।
পরিবারে শান্তি ও বরকত
হালাল রিজিক পরিবারে স্থায়ী শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা এনে দেয়। স্বল্প সম্পদও আল্লাহ্র রহমতে পর্যাপ্ত মনে হয়।
দোয়া সহজে গ্রহণযোগ্য হওয়া
যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য গ্রহণ করে, আল্লাহ্ তার দোয়া দ্রুত কবুল করেন এবং তার উপর সন্তুষ্ট থাকেন।
সন্তানের চরিত্র ও ভবিষ্যত গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা
হালাল অর্থে লালন-পালন হলে সন্তানরা আল্লাহ্র প্রতি অনুগত হয় এবং সৎ ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।
পরকালে সফলতা ও নিরাপত্তা
রাসূল (সা.) বলেছেন, হালাল উপার্জনের খোঁজে বের হওয়া ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সফল হবে এবং আল্লাহ্র আরশের নিচে নিরাপত্তা পাবে।
হাদিস ও কুরআনের দলিল
হালাল রিজিক সম্পর্কে কুরআনের উল্লেখ
- ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম: “আল্লাহ্ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন” (সূরা আল-বাকারা, ২: ২৭৫)।
- সৎকর্ম ও হালাল ভক্ষণ: আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন, “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎকর্ম করো।” (সূরা আল-মুমিনূন, ২৩: ৫১)।
হারাম আয়ের নিষেধাজ্ঞা
রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে শরীর হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত, তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উত্তম।” (তিরমিযী)
নবী (স.)-এর নির্দেশনা ও শিক্ষণীয় ঘটনা
রাসূল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় সর্বদা নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো খায়নি।” (সহীহ বুখারী)
আধুনিক জীবনে হারাম আয় থেকে বাঁচার উপায়
সততার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করা
ইন্টারনেট বা যেকোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও পণ্যের সঠিক তথ্য দেওয়া এবং চুক্তির শর্তাবলী স্পষ্ট রাখা।
চাকরিতে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন
আধুনিক কর্মপরিবেশে কাজে ফাঁকি দেওয়া বা সময় চুরি করা (টাইম থেফট) থেকে বিরত থাকা, কারণ এটি বেতনের বিনিময়ে আমানতের খেয়ানত।
লোভ ও বেআইনি লাভ এড়ানো
দ্রুত অর্থ লাভের জন্য পিরামিড স্কিম, ক্রিপ্টোকারেন্সির ঝুঁকিপূর্ণ ও সন্দেহজনক বিনিয়োগ (যদি শরীয়াহ সম্মত না হয়) বা অন্য কোনো বেআইনি লোভনীয় প্রস্তাব থেকে দূরে থাকা।
শ্রদ্ধা ও সঠিক লেনদেনের নীতি
অর্থনৈতিক লেনদেনে মানুষের অধিকারকে সম্মান করা এবং কোনো চুক্তিতে অন্যায় শর্ত আরোপ না করা।
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখা
দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ্ এবং হালাল পথ অবলম্বন করলে তিনি অবশ্যই প্রয়োজন মেটাবেন। এই তাওয়াক্কুল মানুষকে হারাম উপার্জনের তাড়না থেকে বাঁচায়।
হালাল রিজিক অর্জনের জন্য করণীয়
প্রতিদিন হালাল রিজিকের দোয়া করা
প্রতিদিন সালাতের পর আল্লাহ্র কাছে পবিত্র (ত্বইয়্যিব) ও বরকতময় রিজিকের জন্য বিশেষ দোয়া করা। যেমন, ইস্তেগফার ও তাওবার সাথে দোয়া করা।
ব্যবসায় সততার নীতি অনুসরণ
লেনদেনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও সত্যবাদিতা বজায় রাখা। ত্রুটি থাকলে তা ক্রেতাকে জানিয়ে দেওয়া।
আমানতদার ও সৎ হওয়া
নিজের বা অন্যের সম্পদ, দায়িত্ব এবং তথ্যের ক্ষেত্রে আমানতদারী রক্ষা করা। খেয়ানতকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা।
উপার্জনের হিসাব স্বচ্ছ রাখা
নিজের আয় ও ব্যয়ের উৎস সম্পর্কে সর্বদা সচেতন ও স্বচ্ছ থাকা। নিয়মিত হিসাব নিরীক্ষা করা।
সন্তানদের হালাল উপার্জনে অনুপ্রাণিত করা
ছোটবেলা থেকেই হালাল-হারাম শিক্ষা
খেলার ছলে বা গল্পের মাধ্যমে সন্তানদের হালাল-হারামের পার্থক্য ও এর গুরুত্ব বোঝানো। উদাহরণ দিয়ে শেখানো যে, সততা সবসময় লাভের চেয়ে উত্তম।
অভিভাবকের চরিত্রই বড় শিক্ষা
পিতা-মাতা যদি নিজেরা হালাল উপার্জনকারী হন এবং সৎ জীবন যাপন করেন, তবে সন্তানরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই নৈতিকতা গ্রহণ করে।
পরিবারের সকল সদস্যকে এতে যুক্ত করা
পারিবারিক সভা বা আলোচনায় সৎ ও হালাল উপার্জনের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলা এবং পরিবারের উপার্জনের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
হালাল রিজিক কেবল একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ এবং সফল জীবনের ভিত্তি। হালাল পথ অবলম্বন করলে আল্লাহ্ ইহকালে শান্তি ও বরকত দান করেন এবং পরকালে নিশ্চিত সফলতা লাভ হয়। বিপরীতে, হারাম রিজিক জীবনের সকল কল্যাণকে নষ্ট করে দেয়। একজন মুমিন হিসেবে আমাদের দৃঢ় সংকল্প হওয়া উচিত যে, আমরা আল্লাহ্র উপর পূর্ণ আস্থা রেখে, সকল প্রকার হারাম পথ পরিহার করে, শুধু পবিত্র ও হালাল উপায়েই আমাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করব।
হারাম রিজিকের ক্ষতি ও হালাল আয়ের গুরুত্ব প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: ইসলামে রিজিক কেন শুধু সম্পদ নয়?
উত্তর: রিজিক হলো আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দেওয়া সমস্ত নেয়ামত, যার মধ্যে অর্থ, স্বাস্থ্য, শান্তি, জ্ঞান ও উত্তম সন্তান সবই অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন: হালাল উপার্জনের ইসলামী সংজ্ঞা কী?
উত্তর: হালাল উপার্জন হলো বৈধ উপায়ে, সততা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে অর্জিত অর্থ, যেখানে সুদ, জুয়া বা প্রতারণা নেই।
প্রশ্ন: হারাম উপার্জনকারীর দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: রাসূল (সা.) বলেছেন, হারাম খাদ্য ও অর্থে গঠিত শরীর নিয়ে দোয়া করলে আল্লাহ্ তা কবুল করেন না, কারণ হারাম রিজিক ইবাদতের পবিত্রতা নষ্ট করে।
প্রশ্ন: কুরআন অনুযায়ী সরাসরি নিষিদ্ধ আয়ের প্রধান উদাহরণ কী?
উত্তর: পবিত্র কুরআন অনুযায়ী সবচেয়ে বড় নিষিদ্ধ আয়ের একটি হলো সুদ (রিবা)।
প্রশ্ন: জুয়া খেলা বা বাজি ধরে টাকা জেতা কি হালাল?
উত্তর: না, জুয়া (মাইসির) স্পষ্টত হারাম এবং ইসলামী শরীয়াহতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন: ঘুষ লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান কী?
উত্তর: ঘুষ দেওয়া এবং নেওয়া উভয় কাজই মারাত্মক গুনাহ, এবং রাসূল (সা.) উভয়কেই অভিশাপ দিয়েছেন।
প্রশ্ন: কাজে ফাঁকি দিয়ে পুরো বেতন নেওয়া কি হালাল?
উত্তর: না, কাজে ফাঁকি দেওয়া বা সময় চুরি করা এক ধরনের আমানতের খেয়ানত, যা উপার্জনকে হারামের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রশ্ন: হালাল উপার্জন পরিবারে কী নিয়ে আসে?
উত্তর: হালাল উপার্জন পরিবারে মানসিক শান্তি, আল্লাহ্র বরকত এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আসে।
প্রশ্ন: সন্তানের চরিত্র গঠনে হালাল খাদ্যের প্রভাব কেমন?
উত্তর: হালাল খাদ্যে প্রতিপালিত সন্তানরা সৎ, ধার্মিক ও চরিত্রবান হয়।
প্রশ্ন: ব্যবসায়িক প্রতারণা বা পণ্যের ত্রুটি গোপন করা কি হারাম?
উত্তর: হ্যাঁ, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা প্রতারণার শামিল এবং এর মাধ্যমে অর্জিত লাভ হারাম।
প্রশ্ন: হারাম আয়ের অর্থ দিয়ে হজ করলে কি তা কবুল হবে?
উত্তর: অধিকাংশ আলেমের মতে, হারাম আয়ের অর্থ দিয়ে সম্পাদিত ইবাদত আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশ্ন: মৃত্যুর পর উপার্জন সম্পর্কে কী জবাবদিহি করতে হবে?
উত্তর: কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে যে, কোন পথে সম্পদ উপার্জন করা হয়েছে এবং কিভাবে ব্যয় করা হয়েছে।
প্রশ্ন: ব্যবসায়ী কিভাবে ওজনে কারচুপি থেকে বাঁচতে পারে?
উত্তর: সঠিক মাপযন্ত্র ব্যবহার করে এবং সর্বদা ওজনে পূর্ণতা নিশ্চিত করে।
প্রশ্ন: লোভ কীভাবে হারাম আয়ের দিকে নিয়ে যায়?
উত্তর: দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ মানুষকে হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে যেকোনো অবৈধ পথে টাকা উপার্জনে উৎসাহিত করে।
প্রশ্ন: হালাল রিজিকের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা কেন জরুরি?
উত্তর: আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) থাকলে মানুষ হতাশ হয়ে হারাম পথে যায় না এবং বিশ্বাস রাখে যে আল্লাহ্ই রিজিকদাতা।
প্রশ্ন: হালাল রিজিক চাইতে প্রতিদিনের দোয়া কী?
উত্তর: প্রতিদিন এই দোয়া করা: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা রিযকান ত্বইয়্যিবান” (হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে পবিত্র রিজিক প্রার্থনা করছি)।
প্রশ্ন: চাকরিতে আমানতদার হওয়া বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: এর অর্থ হলো অফিসের সময়, সম্পদ ও তথ্য সততার সাথে এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা।
প্রশ্ন: সন্তানেরা হালাল-হারাম শিক্ষা কিভাবে পায়?
উত্তর: মূলত পিতা-মাতার নিজেদের সততা ও নৈতিক জীবনযাপন দেখে সন্তানেরা এই শিক্ষা পায়।
প্রশ্ন: বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো কি বৈধ?
উত্তর: না, কৃত্রিমভাবে পণ্যের মজুদদারি বা দাম বাড়ানো (احتکار) ইসলামী নীতিতে নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন: হারাম রিজিক কি কেবল অর্থকেই বোঝায়?
উত্তর: না, হারাম রিজিক দ্বারা হারাম খাদ্য, হারাম বিনোদন বা হারাম পেশা থেকেও আসা যেকোনো সুবিধাকেও বোঝায়।








