নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পাইপলাইনের লিকেজ থেকে ঘরে জমে থাকা গ্যাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের কেউই আর বেঁচে নেই। গত সোমবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে একে একে বাবা, মা ও তাদের তিন সন্তান সবাই রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
সর্বশেষ শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা আক্তার (৩২)। এর মাধ্যমেই পুরো পরিবারটি চিরতরে হারিয়ে গেল।
যেভাবে নিভে গেল পাঁচটি প্রাণ
হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, গত রোববার ভোরের ওই ঘটনার পর থেকে বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন তারা। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে একে একে বিদায় নেন সবাই:
১. সোমবার: পরিবারের প্রধান ও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আবুল কালাম (৩৫) মারা যান।
২. বুধবার: মারা যায় ছোট মেয়ে কথা (৪)।
৩. বৃহস্পতিবার সকাল: মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বড় ছেলে মুন্না (১২)।
৪. বৃহস্পতিবার দুপুর: মারা যায় মেজ মেয়ে মুন্নি (৭)।
৫. শুক্রবার সকাল: সর্বশেষ সদস্য হিসেবে মারা যান মা সালমা আক্তার (৩২)।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, মা সালমা আক্তারের শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মেজ মেয়ে মুন্নির শরীরের প্রায় ৩৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল। শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়ায় শুরু থেকেই তাদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে যা ঘটেছিল
গত রোববার ভোরে ফতুল্লার উত্তর ভুঁইগড় গিরিধারা এলাকার একটি নয়তলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে এই মর্মান্তিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রাতে পাইপলাইনের লিকেজের কারণে ঘরের ভেতরে প্রচুর গ্যাস জমে যায়।
ভোরে পরিবারের কেউ যখন রান্নার জন্য চুলা জ্বালাতে যান অথবা বৈদ্যুতিক সুইচ চালু করেন, তখনই জমে থাকা গ্যাসে স্পার্ক হয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘুমন্ত ও অসচেতন অবস্থায় পরিবারের পাঁচ সদস্যই গুরুতর দগ্ধ হন।
জীবিকার খোঁজে এসে চিরতরে বিদায়
নিহত আবুল কালাম পেশায় একজন সাধারণ সবজি বিক্রেতা ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বরুকদিয়া এলাকায়। পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার ও জীবিকার তাগিদে তারা নারায়ণগঞ্জের ওই ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। কিন্তু একটি গ্যাস লিকেজের অসচেতনতা বা ত্রুটি আজ তাদের পুরো বংশ প্রদীপ নিভিয়ে দিল। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় এবং তাদের গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনা এড়াতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
এই ধরণের দুর্ঘটনা ইদানীং অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফতুল্লার এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত। ঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে বা দীর্ঘ সময় ঘর বন্ধ থাকলে করণীয়:
- ভোরে রান্নাঘরে ঢুকেই আগে দেশলাই বা চুলা জ্বালানো যাবে না।
- ঘরের কোনো বৈদ্যুতিক সুইচ (ফ্যান, লাইট) অন বা অফ করা যাবে না।
- সবার আগে ঘরের দরজা ও জানালা ভালো করে খুলে দিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে জমে থাকা গ্যাস বের হয়ে যায়।
- নিয়মিত পাইপলাইনের লিকেজ পরীক্ষা করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সামান্য অবহেলা বা গ্যাস লাইনের ত্রুটি কীভাবে একটি হাসিখুশি পরিবারকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে। আবুল কালামের পুরো পরিবারের এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। এই ধরণের অবৈধ বা ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস লাইনের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন, যাতে আর কোনো পরিবারকে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়।








