দেশের ব্যাংকিং খাতে বড়সড় পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। সমস্যাগ্রস্ত ৫টি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য একটি বড় দুঃসংবাদ এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের জন্য তাদের জমানো টাকার ওপর কোনো প্রকার মুনাফা বা লাভ পাবেন না।
বুধবার (১৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের অনুমোদনের পর এই কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মূলত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কোন ৫টি ব্যাংকের মুনাফা বন্ধ হলো?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় থাকা সমস্যাগ্রস্ত এই পাঁচটি ব্যাংক হলো:
১. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL)
২. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (FSIBL)
৩. এক্সিম ব্যাংক (Exim Bank)
৪. ইউনিয়ন ব্যাংক (Union Bank)
৫. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (Global Islami Bank)
এই ব্যাংকগুলো আর আগের মতো থাকছে না। এগুলোকে একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে, যার নাম হবে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ (Combined Islamic Bank)। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলে ধীরে ধীরে এই পাঁচটি ব্যাংকের নাম বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
মুনাফা কেন দেওয়া হবে না?
ব্যাংক রেজুলেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে পাঠানো চিঠিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ‘ব্যাংক রেজুলেশন স্কিম’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সব আমানত হিসাবের স্থিতি নতুন করে গণনা করা হবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। অর্থাৎ এই দুই বছর আপনার টাকা ব্যাংকে থাকলেও কোনো বাড়তি লাভ যোগ হবে না। উল্টো ‘হেয়ারকাট’ (Haircut) বা নির্দিষ্ট হারে স্থিতি কমিয়ে চূড়ান্ত হিসাব করা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, এই দুই বছরের মুনাফা বাদ দিয়েই আমানতের চূড়ান্ত স্থিতি নির্ধারণ করা হবে।
টাকা উত্তোলনের নতুন নিয়ম কী?
গ্রাহকদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘আমার জমানো টাকা কি আমি তুলতে পারব?’ এ বিষয়েও পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
উত্তোলনের নিয়মাবলী
- ২ লাখ টাকা পর্যন্ত: যাদের আমানত ২ লাখ টাকার নিচে, তারা ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর যেকোনো সময় পুরো টাকা তুলতে পারবেন।
- ২ লাখ টাকার বেশি: যাদের আমানত ২ লাখ টাকার বেশি, তারা চাইলেই সব টাকা একসাথে তুলতে পারবেন না। প্রতি তিন মাস পর পর সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করে উত্তোলন করা যাবে। এভাবে সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে টাকা তুলতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের (কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট) ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
নতুন ব্যাংকের কাঠামো ও শেয়ার পদ্ধতি
পাঁচটি ব্যাংক মিলে যে নতুন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠিত হচ্ছে, তার প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকার মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনে। নতুন এই ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
শেয়ার বিন্যাস:
- ‘ক’ শ্রেণির শেয়ার: সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে, যা ‘ক’ শ্রেণির শেয়ার হিসেবে গণ্য হবে।
- ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির শেয়ার: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানতের একটি অংশ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আমানত থেকে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা করে মোট ১৫ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।
স্থায়ী আমানত বা এফডিআর-এর কী হবে?
যাদের এই ব্যাংকগুলোতে ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) বা মেয়াদি আমানত আছে, তাদের জন্যও নির্দেশনা রয়েছে:
- স্থায়ী আমানতের বিপরীতে গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন।
- মেয়াদ শেষ হলে আমানত স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন বা দীর্ঘমেয়াদে রূপান্তরিত হবে।
- যাদের আমানতের মেয়াদ ৪ বছরের বেশি, তারা মেয়াদ পূর্তির পরই টাকা ফেরত পাবেন।
ব্যাংক খাতের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ফলে লাখ লাখ গ্রাহক সাময়িক অসুবিধায় পড়লেও, দীর্ঘমেয়াদে আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।








