ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এক বিরল ও অবিশ্বাস্য দৃশ্যের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। সোমবার ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের (Manchester United) বিপক্ষে ম্যাচে সতীর্থকে চড় মেরে লাল কার্ড দেখলেন এভারটনের মিডফিল্ডার ইদ্রিসা গেয়ি (Idrissa Gueye)। মাত্র ১৩ মিনিটেই ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও, ১২ বছর পর ইউনাইটেডের মাঠে ১-০ গোলের ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিল এভারটন (Everton)।
এই নাটকীয় জয়টি এভারটনের জন্য কেবল পয়েন্ট টেবিলে স্থান পরিবর্তন নয়, বরং এটি তাদের ১২ বছরের পুরনো ওল্ড ট্র্যাফোর্ড জয়খরা কাটানোর প্রতীকী সাফল্য।
১৩ মিনিটে বিতর্কিত লাল কার্ড: গেয়ি বনাম কিন
ম্যাচের শুরুতেই এভারটন ধাক্কা খায়। দশম মিনিটে ডিফেন্ডার সিমাস কোলম্যান ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়েন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা।
দশম মিনিটে একটি বল ক্লিয়ার করা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয় ইদ্রিসা গেয়ি এবং ডিফেন্ডার মাইকেল কিনের (Michael Keane) মধ্যে। কিন পাসটি ঠিকঠাক বুঝতে না পারায় বল চলে যায় ইউনাইটেডের ব্রুনো ফের্নান্দেসের কাছে। এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে গেয়ি কিনের দিকে তেড়ে যান এবং মুখের উপর কথা বলতে থাকেন।
- ঘটনার সূত্রপাত: কিনের ভুল পাস এবং বল ক্লিয়ার করতে না পারা।
- চূড়ান্ত দৃশ্য: কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মাইকেল কিন গেয়িকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। তাতে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গেয়ি সতীর্থ কিনের গালে বাঁ-হাতে চড় বসিয়ে দেন।
- রেফারির সিদ্ধান্ত: কাছে থাকা রেফারি টনি হ্যারিংটন সঙ্গে সঙ্গে গেয়িকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ভিএআর (VAR) পর্যালোচনার পরও সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড দু’বার ছুটে গিয়ে গেয়িকে শান্ত করেন এবং মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যান।
১৭ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয় ঘটনা
ফুটবল মাঠে সতীর্থকে আঘাত করে লাল কার্ড দেখার ঘটনা প্রিমিয়ার লিগে খুবই বিরল। ১৭ বছর পর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল:
- পূর্ববর্তী ঘটনা: ২০০৮ সালে স্টোক সিটির রিকার্ডো ফুলার সতীর্থ অ্যান্ডি গ্রিফিনকে চড় মেরে লাল কার্ড পেয়েছিলেন।
কিয়েরনান ড্রুজবেরি-হলের গোলে ১২ বছরের অপেক্ষা শেষ
১০ জনের দল হয়ে যাওয়ার পরও এভারটন লড়াই চালিয়ে যায়। ম্যাচের ২৯তম মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মিডফিল্ডার কিয়েরনান ড্রুজবেরি-হল (Kiernan Dewsbury-Hall)।
- গোলের ধরন: বক্সের বেশ বাইরে বল পেয়ে ড্রুজবেরি-হল ইউনাইটেডের দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে সুযোগ তৈরি করেন। এরপর বক্সের মাথা থেকে আচমকা গতির শটে দূরের পোস্টে গোল করেন। ইউনাইটেডের গোলকিপার সেই শট আটকানোর সুযোগ পাননি।
- ঐতিহাসিক জয়: ড্রুজবেরি-হলের এই গোলটিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং ১২ বছর পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে এভারটনকে জয় এনে দেয়।
ডেভিড ময়েসের মন্তব্য: ‘জয়ী দলে এমন প্রতিক্রিয়া চাই’
এভারটনের কোচ ডেভিড ময়েস (David Moyes) ম্যাচের পর গেয়ির আচরণের সমালোচনা করলেও তার আবেগটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন:
“ফুটবলে এসব হয়েই থাকে। আমার মনে হয়, রেফারি একটু সময় নিয়ে ব্যাপারটা সামলাতে পারতেন… সে (গেয়ি) পরে ক্ষমা চেয়েছে এবং সতীর্থদের প্রশংসা করেছে।” “মাঠে কেউ ভুল করলে নিজেদের মধ্যে লড়াই বা বিরক্ত হওয়ার ব্যাপারটি আমি পছন্দ করি। জয়ী একটি দল গড়তে হলে এমন ফুটবলার আমাদের প্রয়োজন, যারা এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।”
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিব্রতকর হার
ম্যাচের বাকি সময় বল নিয়ন্ত্রণে ইউনাইটেড এগিয়ে থাকলেও, তারা গোল করতে ব্যর্থ হয়। এভারটনের গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড (Jordan Pickford) দারুণ কিছু সেভ করে দলের জয় নিশ্চিত করেন।
- ইউনাইটেডের হতাশা: এই ম্যাচ জিতলে ইউনাইটেড পয়েন্ট তালিকার পাঁচে উঠে আসতে পারত।
- রেকর্ড: প্রতিপক্ষের একজন লাল কার্ড দেখার পরও নিজেদের ঘরের মাঠে প্রিমিয়ার লিগে এই প্রথম কোনো ম্যাচ হারল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
- কোচ অ্যামুরির মন্তব্য: ইউনাইটেড কোচ হুবেন অ্যামুরি স্বীকার করেন, “আমাদের ১১ জনের তুলনায় ওরা ১০ জন নিয়েও শ্রেয়তর দল ছিল। আমাদের ভেতর সেই তাড়না ছিল না। জয় তাদেরই প্রাপ্য ছিল।”
এই জয়ের পর এভারটন এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড উভয়েই ১০ ম্যাচে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে যথাক্রমে ১১ এবং ১০ নম্বরে অবস্থান করছে।








