সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে আলোচিত নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘এপস্টেইন ফাইলস’। দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সাথে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কের নথিপত্র একে একে সামনে আসছে। তবে এবার যা সামনে এলো, তা শুধু ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এবং জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দেওয়ার এক ভয়ংকর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং জেফরি এপস্টেইনের একটি গোপন অডিও রেকর্ডিং ফাঁস হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অডিওতে এমন কিছু পরিকল্পনা শোনা গেছে যা ইসরাইল এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের বর্তমান চিত্রকে পুরোপুরি পাল্টে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
১০ লাখ রাশিয়ান অভিবাসী: জনতাত্ত্বিক প্রকৌশলের নীল নকশা
ফাঁস হওয়া কথোপকথনে শোনা যায়, এহুদ বারাক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বারবার অনুরোধ করেছিলেন যেন আরও ১০ লাখ রাশিয়ানকে ইসরাইলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বারাকের মতে, এই বিপুল সংখ্যক অভিবাসী যদি ইসরাইলে আসে, তবে দেশটির জনতাত্ত্বিক চিত্রে একটি ‘বিপ্লবিক পরিবর্তন’ আসবে।
কিন্তু কেন এই বিপুল জনবল চেয়েছিলেন তিনি? এর মূল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের সংখ্যাগত প্রভাব কমিয়ে আনা। ইসরাইল রাষ্ট্রটি দীর্ঘকাল ধরেই ফিলিস্তিনিদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত। বারাক মনে করতেন, যদি ১০ লাখ রাশিয়ানকে নাগরিকত্ব দিয়ে বসতি স্থাপন করানো যায়, তবে ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।
ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতি কমানোর কৌশল
অডিওতে এহুদ বারাক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ইসরাইল খুব সহজেই এই বাড়তি জনসংখ্যাকে নিজের ভেতর শুষে নিতে পারবে। তার এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেকোনো মূল্যে বজায় রাখা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত একটি ‘ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা জনতাত্ত্বিক প্রকৌশল। যেখানে কৃত্রিমভাবে বাইরের দেশের মানুষকে এনে একটি নির্দিষ্ট এলাকার আদিবাসীদের প্রভাব খর্ব করার চেষ্টা করা হয়। এহুদ বারাকের মতো একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকের মুখে এমন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আরব ও মুসলিম দেশ থেকে আসা ইহুদিদের প্রতি অবজ্ঞা
এই অডিওর আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো অন্য ইহুদিদের প্রতি বারাকের মনোভাব। তিনি অতীতে আরব এবং বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশ থেকে ইসরাইলে আসা ইহুদিদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, এখন সময় এসেছে অভিবাসী গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও ‘বাছাইপ্রবণ’ হওয়ার।
তার মতে, এখন ‘গুণগত মান’ বজায় রাখার সময়। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি ইউরোপীয় বা রাশিয়ান ইহুদিদের যেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন, এশীয় বা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ইহুদিদের সেভাবে দেখছেন না। এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া
এই অডিও ফাঁসের পর ইসরাইলের ভেতরে এবং বাইরে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার মস্কোর সাবেক প্রধান রাব্বি পিনচাস গোল্ডস্মিড এই উদ্যোগকে একটি ‘উদ্ভট পরিকল্পনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্ম ও জাতীয়তাকে এভাবে ব্যবহার করা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
অন্যদিকে, মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন যে, এই রেকর্ডিং প্রমাণ করে ইসরাইলের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকরা পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। জেফরি এপস্টেইনের মতো একজন দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর সাথে এই ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করা এহুদ বারাকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
কেন জেফরি এপস্টেইনের সাথে এই আলোচনা?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেন তার দেশের জনতাত্ত্বিক পরিকল্পনা নিয়ে একজন বিতর্কিত ব্যক্তির সাথে আলোচনা করবেন? জেফরি এপস্টেইনের সাথে বারাকের এই গভীর সম্পর্ক এখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে। এপস্টেইন কী কেবল একজন অপরাধী ছিলেন, নাকি তিনি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর হয়ে রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এহুদ বারাক ও জেফরি এপস্টেইন ফাইলস থেকে বেরিয়ে আসা এই তথ্যগুলো কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকটের পেছনের কালো সত্যগুলোকেও সামনে নিয়ে এসেছে। জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি জাতিকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এই ছক আধুনিক বিশ্বে বিরল। আল জাজিরার এই প্রতিবেদনটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের মোড় নিতে পারে।








