হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Sunday, August 16, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeআর্ন্তজাতিকভারতে মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা: ভয় ও অন্তহীন হতাশার এক জীবনগাথা
spot_img

ভারতে মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা: ভয় ও অন্তহীন হতাশার এক জীবনগাথা

ভারত এক বৈচিত্র্যময় দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই বৈচিত্র্যের মধ্যে এক অস্থিরতার কালো মেঘ জমা হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলিমদের মনে দানা বেঁধেছে এক গভীর ভয় ও অনিশ্চয়তা। সম্প্রতি ভারতের প্রখ্যাত লেখক, অনুবাদক ও ইতিহাসবিদ রাখশান্দা জলিল গয়ায় অনুষ্ঠিত এক সাহিত্য উৎসবে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং মুসলিমদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে নিজের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

রাখশান্দা জলিলের চোখে নতুন ভারত

গয়ার সাহিত্য উৎসবে প্রতি বছরই যোগ দেন রাখশান্দা জলিল। এটি এমন এক মঞ্চ যেখানে প্রান্তিক মানুষেরা নিজেদের কথা বলতে পারেন। তবে এবারের পরিবেশ ছিল একটু ভিন্ন। লেখক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ওপর যে একপাক্ষিক ক্ষমতার কালো মেঘ ছেয়ে আছে, তা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে। উৎসবে এসে নিজের পরিচয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রথমে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন। কিন্তু পরে তাঁর মনে হয়েছে, যদি নিজের মনের ভয় আর শঙ্কার কথা এখানেই না বলা যায়, তবে আর কোথায় বলা যাবে?

অস্তিত্ব বিলীনের এক অজানা ভয়

রাখশান্দা জলিলের বক্তব্যে এক ভয়াবহ সত্য উঠে এসেছে। তিনি বলেন, “আমি সেই ভয় নিয়ে কথা বলতে চাই যা এখন আমাদের বাস্তব জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” এই ভয় কেবল মুসলিমদের নয়, বরং ভারতের প্রতিটি সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক মানুষের মনে ছড়িয়ে পড়েছে। লেখক মনে করেন, এমনকি অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যেও এই ভয় কাজ করছে।

তাঁর মতে, এই ভয় এখন এক স্থায়ী হতাশায় রূপ নিয়েছে। তিনি একে তুলনা করেছেন ‘হালকা তাপমাত্রার জ্বরের’ সাথে। এই জ্বর যেমন মানুষের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ করে দেয় না, কিন্তু শরীরকে সবসময় অস্বস্তিতে রাখে; ভারতের মুসলিমদের অবস্থাও এখন ঠিক তেমন। এক অদৃশ্য ভয় সবসময় তাঁদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করছে।

শহুরে মুসলিমদের নীরবতা ও আতঙ্ক

রাখশান্দা জলিল লক্ষ্য করেছেন যে, তাঁর মতো উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত মুসলিমদের মধ্যেও এক ধরণের নীরবতা কাজ করছে। বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক কোনো বিতর্ক বা স্পর্শকাতর বিষয়ে তাঁরা কথা বলতে চান না। স্কুল, কলেজ বা হাউজিং সোসাইটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতেও তাঁরা পুরোপুরি নীরব।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো সহিংসতার প্রতিবাদে পোস্ট দিলেও মুহূর্তের মধ্যে তা আবার ডিলিট করে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই নীরবতা প্রমাণ করে যে, শিক্ষিত মুসলিমরা নিজেদের নিরাপদ রাখতে সমাজ ও রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। কোনো সহিংসতার ঘটনায় অপরাধী মুসলিম হলে তো আর কথাই নেই, তাঁরা সেই আলোচনার ধারেকাছেও যেতে চান না।

প্রান্তিক মুসলিমদের জীবনসংগ্রাম: নাম ও পরিচয় লুকানোর চেষ্টা

লেখক মনে করেন, তাঁর মতো সুরক্ষিত পরিবেশে থাকা মানুষ যদি এত ভয় পান, তবে সাধারণ দরিদ্র মুসলিমদের অবস্থা কল্পনা করাও কঠিন। কারণ দিনমজুর, ইলেকট্রিশিয়ান, রঙমিস্ত্রি বা সবজি বিক্রেতাদের কোনো শক্তিশালী সুরক্ষা বলয় নেই।

বর্তমান ভারতের অনেক জায়গায় নিম্ন আয়ের মুসলিমরা নিজেদের আসল নাম বা পরিচয় দিতে ভয় পান। তাঁদের আশঙ্কা, পরিচয় জানাজানি হলে তাঁরা হয়তো কাজ পাবেন না। অনেক সবজি বিক্রেতা জীবন রক্ষার্থে নিজের ভ্যানের সামনে গেরুয়া পতাকা লাগাতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশা যেমন মেকানিক, দর্জি বা কাবাব বিক্রেতারাও এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার মসজিদগুলোতে কর্মরত ইমাম ও নায়েব ইমামদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন রাখশান্দা।

নামই যখন ভয়ের কারণ

রাখশান্দা জলিলের মতে, তিনি দেখতে প্রথাগত মুসলিমদের মতো নন বলে হয়তো অনেক সময় মানুষের ভিড়ে নিরাপদ থাকেন। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। তিনি বলেন, “যতক্ষণ আমার নাম প্রকাশ না পায় ততক্ষণ আমি হয়তো নিরাপদ, কিন্তু নাম কীভাবে গোপন রাখা যায়? নামই তো মানুষের বড় পরিচয়।”

তিনি আরও বলেন, তাঁর নামের প্রথম অংশ অনেক সুবিধা দিলেও পদবি স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি একজন মুসলিম। ভারতের বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে যদি উগ্র জনতা তাঁকে ঘিরে ধরে, তবে তাঁর শিক্ষা, সুযোগ-সুবিধা বা উচ্চপদস্থ বন্ধুরাও হয়তো তাঁকে বাঁচাতে পারবে না। এই চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তাই এখন ভারতের মুসলিমদের দৈনন্দিন সঙ্গী।


রাখশান্দা জলিলের এই বক্তব্য কেবল একজনের মনের কথা নয়, বরং এটি বর্তমান ভারতের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিচ্ছবি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে যখন কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষ নিজেদের পরিচয় দিতে ভয় পায় বা স্থায়ী হতাশায় নিমজ্জিত হয়, তখন তা সেই দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারত কি পারবে তাঁর এই হারানো সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে? এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!