বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কথিত সহিংসতার অভিযোগ তুলে ভারতীয় আদালতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছিল। তবে দিল্লি হাইকোর্ট সেই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বুধবার এই সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) শুনানির জন্য উঠলে আদালত তা খারিজ করে দেয় এবং আবেদনকারীকে আদালতের সময় নষ্ট না করার জন্য সতর্ক করে।
এই রায়ের ফলে ভারতের মাটিতে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যেতে আইনগত কোনো বাধা রইল না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ: কেন খারিজ হলো আবেদন?
প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুরুতেই মামলাটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদালতের মতে, এই আবেদনটি আবেগের বশবর্তী হয়ে করা হলেও এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ক্রিকেট দলকে নিষিদ্ধ করা বা অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি পুরোপুরি পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অংশ। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র সরকারের, আদালতের নয়।
বিচারকরা মন্তব্য করেন, “আদালত সরকারকে নির্দেশ দিতে পারে না যে তারা অন্য দেশের সাথে কেমন আচরণ করবে। এছাড়া ভারতের সীমানার বাইরের কোনো বিষয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়াও আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।”
আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর আদালতের এখতিয়ার নেই
মামলার শুনানিকারীরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি), বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধেও নির্দেশনা চেয়েছিলেন। এই দাবির প্রেক্ষিতে আদালত আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, ভারতীয় সংবিধানের ২২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা বা অন্য দেশের ক্রিকেট বোর্ডের ওপর ভারতীয় আদালত কোনো নির্দেশ চাপিয়ে দিতে পারে না।
শুনানিতে বিসিসিআই-এর (BCCI) পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনিও আদালতের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, “মামলায় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডকে পক্ষ করা হয়েছে, যা ভারতীয় আদালতের বিচারিক সীমার বাইরে।”
আবেদনকারীকে আদালতের সতর্কবার্তা
মামলাটি দায়ের করেছিলেন একজন আইনের ছাত্র। তিনি নিজেকে সচেতন নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিলেও আদালত তার এই পদক্ষেপে বিরক্তি প্রকাশ করে। বেঞ্চের মতে, ব্যক্তিগত ধারণা বা কল্পনার ওপর ভিত্তি করে জনস্বার্থ মামলা করা যায় না।
আদালত আবেদনকারীকে সতর্ক করে বলে, “এ ধরনের মামলা জনস্বার্থ মামলার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।” বিচারকরা হুঁশিয়ারি দেন যে, ভবিষ্যতে এমন ভিত্তিহীন মামলা করলে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হতে পারে।
শুনানির এক পর্যায়ে আবেদনকারী পাকিস্তানের একটি পুরনো রায়ের উদাহরণ টানার চেষ্টা করেন। কিন্তু আদালত তা নস্যাৎ করে দিয়ে জানায়, ভারতীয় সাংবিধানিক আদালত নিজস্ব আইন ও সংবিধান মেনে চলে, পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থা অনুসরণ করে না।
মামলা প্রত্যাহার এবং আদালতের পরামর্শ
বেঞ্চের কঠোর অবস্থান ও আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত আবেদনকারী মামলাটি তুলে নেওয়ার অনুমতি চান। আদালত তাকে মামলা প্রত্যাহারের অনুমতি দেয় এবং মামলাটি ‘প্রত্যাহার হিসেবে খারিজ’ ঘোষণা করে।
যাওয়ার আগে প্রধান বিচারপতি আবেদনকারীকে পরামর্শ দেন, “একজন আইনের ছাত্র হিসেবে আপনার উচিত আরও গঠনমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করা। ভিত্তিহীন বিষয়ে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা কাম্য নয়।”
এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং খেলাধুলার বিষয়টি আবেগের চেয়ে কূটনৈতিক ও সরকারি সিদ্ধান্তের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। ভারতের আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা আদালত প্রাঙ্গণ নয়।
সূত্র: এনডিটিভি








