ভোটের আগে সরকারের মধ্যে থাকা বিতর্কিত ব্যক্তিদের দ্রুত সরে যাওয়ার যে মন্তব্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী করেছেন, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি ‘শান্তিপূর্ণ ট্রানজিশন’ এবং ‘নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ’ নিশ্চিত করার জন্য প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আসা এক সুস্পষ্ট দাবি। জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তাঁর দেওয়া বক্তব্যগুলো বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
কেয়ারটেকার সরকারের ভূমিকায় অন্তর্বর্তী সরকার
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বক্তব্যের মূল সুরটি বেঁধেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যেহেতু নির্বাচনের আগে সাংবিধানিকভাবে আর কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা কেয়ারটেকার সরকার আসার সুযোগ নেই, সেহেতু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকেই অতিসত্বর ‘কেয়ারটেকার সরকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে’।
তাঁর মতে, এই ‘কেয়ারটেকার মুডে’ চলে যাওয়ার অর্থ হলো ‘পুরোপুরি নিরপেক্ষ অবস্থানে যাওয়া’। তিনি বলছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারের অভ্যন্তরে এবং বাইরে থাকা ‘বিতর্কিত লোকগুলাকে চলে যেতে হবে’। এই ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকলে জনগণের কাছে এই বার্তা পৌঁছাবে না যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার সঠিক নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে।
“যাদেরকে নিয়ে বিতর্ক আছে সেই লোকগুলাকে চলে যেতে হবে। তারা থাকলেই তো প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সকলের কাছে মেসেজ যাবে, ক্লিয়ার মেসেজ যাবে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার সঠিক নিরপেক্ষ ভূমিকায় অন্তর্বর্তী হয়েছেন।”
এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে বিএনপির দৃষ্টিতে প্রশাসনের অভ্যন্তরে কিছু ব্যক্তি বা পদাধিকারী তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। তাই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব নয়, বরং প্রশাসনের সকল স্তরের বিতর্কিতদের অপসারণ জরুরি।
ড. ইউনূসের সাথে বৈঠক এবং প্রশাসনের আস্থা
আমীর খসরুর এই মন্তব্যটি আগের দিন (মঙ্গলবার রাতে) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বিএনপির নেতাদের বৈঠকের প্রতি ইঙ্গিত করে দেওয়া হয়েছে। সেই বৈঠকে বিএনপি একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস পেয়েছে, নির্বাচনের আগে প্রশাসনে যেকোনো ধরনের বদলি বা পদায়ন সরাসরি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধানেই হবে।
এই আশ্বাসকে বিএনপি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিত্বের হস্তক্ষেপের দাবি করার মাধ্যমে বিএনপি মূলত প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে চায়। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বলেন, “ড. মুহাম্মদ ইউনুস সাহেবের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে। উনারতো সম্মানের সাথে যেতে হবে…আমরা সেটা তো চাই।” এই কথা বলার মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, সরকারপ্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের পদত্যাগের কোনো দাবি নেই, বরং তাঁর নেতৃত্বে একটি শান্তিপূর্ণ ট্রানজিশন প্রক্রিয়া চায় বিএনপি।
কিন্তু একই সাথে তিনি সতর্ক করেছেন, “এখানে সরকারের ভেতরে, সরকারের বাইরে যারা নিরপেক্ষতাকে ভঙ্গ করার সুযোগ আছে তাদেরকে রেখে নিরপেক্ষতা রক্ষা করা যাবে না।” তিনি উল্লেখ করেন, “অনেকগুলো পদায়ন, অনেকগুলো বদলি, অনেকগুলো বিষয়ে সরকারের অবস্থান যে, কিছু কিছু লোক এগুলোকে প্রভাবিত করছে।” এই প্রভাবকে রুদ্ধ করার জন্যই বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদের অপসারণের দাবি উঠেছে।
সংবিধান এবং কেয়ারটেকার সরকারের বৈশিষ্ট্য
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করিয়ে দেন যে কেয়ারটেকার সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে তা সংবিধানেই পরিষ্কারভাবে বলা আছে। যদিও বর্তমানে প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই, তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে সেই ‘বৈশিষ্ট্য’ গুলো অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত:
- গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা: “আমি মনে করি তাদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখন দেওয়া উচিত না। তাদের দৈনন্দিন যে কাজগুলো সেই কাজগুলোতে আস্তে আস্তে চলে যাওয়া উচিত।” এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে গেলে তখন অনেক ধরনের প্রশ্ন উঠে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
- সংবিধানে বর্ণিত কেয়ারটেকার সরকারের ভূমিকা পালন করা: অর্থাৎ, দৈনন্দিন রুটিন কাজগুলো সচল রাখা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা করা, কিন্তু নীতিনির্ধারণী বা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে এমন কোনো কাজ না করা।
এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট হয়, বিএনপি চায় যে অন্তর্বর্তী সরকার তার ক্ষমতাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে একটি ‘মিনিমাম গভর্নমেন্ট’ হিসেবে কাজ করুক, যা কেবল নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করবে।
‘রাস্তার আন্দোলনের দিন শেষ’ এবং গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ
আলোচনা সভায় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ‘ষড়যন্ত্র’ নিয়েও কথা বলেন। তিনি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে রাস্তায় না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা দায়িত্বশীল একটা রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালন করছি, আমরা জোর করে কিছু আদায় করতে যাই নাই। কারণ আমি তো গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।”
তাঁর এই বক্তব্য মূলত অন্য একটি রাজনৈতিক পক্ষকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া, যারা বর্তমানে বিভিন্ন দাবিতে রাস্তায় আন্দোলন করছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “রাস্তায় যাওয়ার তো দিন শেষ হয়ে গেছে শেখ হাসিনাকে বিদায় করা হয়েছে। এখন যাবেন জনগণের কাছে।”
তাঁর মতে, গণতন্ত্রের মূলকথা হলো জনগণের ম্যান্ডেট। কোনো দল যদি তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করতে চায়, তবে তাদের উচিত হবে:
১. ম্যানিফেস্টোতে দাবিগুলো নিয়ে আসা: “আপনার যত দাবি-দাওয়া আছে সবগুলো নিয়ে আগামী নির্বাচনে আপনার ম্যানিফেস্টোতে নিয়ে জনগণের কাছে যান।”
২. জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে পাস করা: এর মাধ্যমে সাংবিধানিক উপায়ে দাবি প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি আন্দোলনকারী পক্ষকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, “রাস্তায় নেমে জোর করে করতে গেলে তাইলে তো আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলেন না। আপনি তো গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছেন।” এই মন্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণকে স্পষ্ট করে তোলে, যেখানে এক পক্ষ রাস্তায় আন্দোলনকে জোর-জবরদস্তি বলে মনে করছে এবং অন্য পক্ষ নির্বাচনকে একমাত্র বৈধ উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
লক্ষ্য: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও জনগণের মালিকানা
আলোচনা সভার মূল থিম ছিল ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব’। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের আগে সর্বাত্মক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো:
- জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া: দেশটাকে স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র গঠন করা।
- সকলের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা: “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রত্যেকটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে, বর্ণ-ইতিহাস-সংস্কৃতি-ভাষা নির্বিশেষে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র যাতে আমরা গঠন করতে পারি এই চেতনায় আমরা এগিয়ে যাব।”
মোটকথা, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য দ্বিমুখী: প্রথমত, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান এবং দ্বিতীয়ত, অগণতান্ত্রিক রাস্তার আন্দোলনকে প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ। এই দুই দাবিই বর্তমানে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।








