হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeব্যবসা ও শিল্পআলু দিয়ে রসমালাই, পায়েস ও পেঁয়াজু! দেশে প্রথম আলু উৎসবের চমক এবং...
spot_img

আলু দিয়ে রসমালাই, পায়েস ও পেঁয়াজু! দেশে প্রথম আলু উৎসবের চমক এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

আলু! আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অতি পরিচিত সবজি। কিন্তু যদি বলা হয়, এই সাধারণ আলু দিয়েই তৈরি হচ্ছে জিভে জল আনা রসমালাই, পায়েস, কেক, হালুয়া, চানাচুর বা সুস্বাদু পেঁয়াজু? হয়তো অনেকেই অবাক হবেন। এমন অবিশ্বাস্য কিন্তু বাস্তব চিত্রই দেখা গেল দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আলু উৎসবে।

রাজধানীর ৩০০ ফুটসংলগ্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) অনুষ্ঠিত এই মেলাটি ছিল আলু উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তির এক মিলনমেলা। বাংলাদেশ হিমাগার সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবে এসে সাধারণ দর্শনার্থীরা যেমন অবাক হয়েছেন, তেমনি ব্যবসায়ী ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা খুঁজে পেয়েছেন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নতুন দিক।

বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা শান্তা ফারহানা, যিনি একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তিনি মেলায় এসে নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন: “আমি জানতাম আলু দিয়ে চিপস আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বানানো হয়। কিন্তু এখানে এসে তো দেখলাম অন্য বিষয়। আলু দিয়ে রসমালাই, পায়েস, কেক, কাটলেট, হালুয়া, চানাচুর, পেঁয়াজু, নিমকিসহ নানা পদ বানানো যায়। এখন আমি বাসাতে এগুলো বানানোর চেষ্টা করব।”

এই আলু উৎসব প্রমাণ করেছে, আলুর ব্যবহার কেবল তরকারি বা চিপসে সীমাবদ্ধ নয়, এটি হাজারো মুখরোচক খাবার তৈরির এক বিশাল সম্ভাবনাময় উৎস।

আলু দিয়ে যত চমকপ্রদ খাদ্যপণ্য

আলু উৎসবে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্রের স্টলটি। এই স্টলে আলু থেকে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছিল।

বারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ টি এম তানজিমুল ইসলাম জানান, মূলত আটার পরিবর্তে আলুর ফ্লেক্স ব্যবহার করে এই পণ্যগুলো তৈরি করা হয়। এর অর্থ হলো, আটা দিয়ে যেসব পণ্য তৈরি করা সম্ভব, আলুর ফ্লেক্স ব্যবহার করে সেগুলোও বানানো যায়। আলুর ফ্লেক্স ব্যবহার করায় সেই খাবারগুলোতে আলুর পুষ্টিগুণ বজায় থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। আলুর এমন বহুমুখী ব্যবহার দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

বীজ থেকে রপ্তানি: আলুর বাণিজ্যিক ইকোসিস্টেম

আলু উৎসবে কেবল তৈরি খাবারই নয়, আলুর পুরো বাণিজ্যিক ক্ষেত্রটিই উঠে এসেছিল। মেলায় দেশি-বিদেশি মোট ৬৬টি স্টল ছিল, যেখানে আলু উৎপাদন, কৃষি যন্ত্রপাতি, কোল্ড চেইন প্রযুক্তি এবং বিশেষ করে বীজ উৎপাদন ও বিপণন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেয়।

উন্নত বীজ ও দেশীয় সক্ষমতা

আলুর উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মালিক সিডসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি থেকে আলুবীজ এনে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছে।

বর্তমানে প্রধানত তিন ধরনের আলুর বীজ পাওয়া যায়: 

১. টেবিল আলু: সাধারণ খাওয়ার আলু। (যেমন: ডায়মন্ড, লেভান্তে, এলুয়েট, প্যারাডিসো, রোনমি)। 

২. শিল্প বা প্রক্রিয়াজাত আলু: চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। (যেমন: সিডনি, মার্কিস, ফন্টেন, সিনোরা, নেপোলিয়ন)। 

৩. রপ্তানি উপযোগী প্রজাতি: যা সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা যায়।

বারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ প্রজাতির আলু রয়েছে, যার মধ্যে বারি উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা ১০৬টি।

এসিআই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এসিআই সিডের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হোসেন সোহরাওয়ার্দী জানান, আলুর উন্নত প্রজাতির বীজ আগে প্রায় সবটাই আমদানিনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন টিস্যু কালচারের মাধ্যমে দেশীয় সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। বিদেশি বীজ থেকে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে নতুন আলু বীজ (চারা) তৈরি করে চার ধাপে সার্টিফায়েড বীজ কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়।

রপ্তানির নতুন দিগন্ত

মেধাস্বত্বের বিষয় থাকায় বিদেশি বীজ থেকে তৈরি আলুর চারা সাধারণত রপ্তানি করা যায় না। তবে দেশীয় কোম্পানিগুলো আলুর বিভিন্ন প্রজাতির সংকরায়ণের মাধ্যমে নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করেছে, যা রপ্তানি করা সম্ভব।

হোসেন সোহরাওয়ার্দী জানান, গত বছর তাঁরা মালয়েশিয়ায় প্রায় ৭০০ টন শিল্প আলু রপ্তানি করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ গুণগত মানসম্পন্ন আলু উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে।

কৃষিকাজের আধুনিকায়ন: যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী

আলু উৎসবে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আলু প্রক্রিয়াজাত করা থেকে শুরু করে মোড়কজাত করা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে এক্সপার্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল সলিউশন-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী চীন, ইতালি, জার্মানি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করে।

মেলায় র‍্যানকন অ্যাগ্রো মেশিনারি-এর স্টলে ছিল ভারতের মাহিন্দ্রা কোম্পানির তৈরি বিশালকায় এক ট্রাক্টর। মাহিন্দ্রার সহকারী ব্যবস্থাপক মো. সোহেল জোয়ারদার জানান, এই ট্রাক্টর একই সঙ্গে জমির মাটি তুলে গুঁড়ো করে এবং সমান (লেবেলিং) করে বীজ বপনের উপযোগী করে তোলে। এর ফলে কৃষকের দুই ধাপের কাজ একবারে সম্পন্ন হয়, যা সময় ও শ্রম বাঁচায়। এই ট্রাক্টরগুলোর দাম ১২ থেকে ১৮ লাখের মধ্যে হলেও, গত মাসে সারা দেশে প্রায় ২০০ ট্রাক্টর বিক্রি হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা নির্দেশ করে।

আলুর ভবিষ্যৎ: আমদানি হ্রাস ও প্রক্রিয়াজাতে জোর

আলু উৎসবের শেষ দিন বিকেলে একটি সেমিনারে আলু রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা জোর দেন দেশের বিশাল খাদ্যপণ্য আমদানি ব্যয় কমানোর ওপর। তিনি বলেন, শুধু রপ্তানির ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং স্থানীয় ভোগ ও চাহিদা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছর আলুর দাম বেশি থাকায় সমস্যা ছিল, আবার এ বছর দাম কমলেও ভোগ কেন বাড়ছে না সেই কারণ ও প্রয়োজনীয় উৎপাদনমাত্রা বিশ্লেষণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ হিমাগার সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, আলু আমাদের দ্বিতীয় প্রধান অর্থকরী ফসল ও খাদ্য।

স্বল্প মেয়াদে (৯০ থেকে ১১০ দিনব্যাপী) আলুর ফলন অন্যান্য খাদ্যশস্যের প্রায় তিন গুণ।

আলুর এই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দেশের অভ্যন্তরে খাদ্য হিসেবে আলুর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

এই আলু থেকে প্রক্রিয়াজাতকৃত বিভিন্ন খাদ্য অধিক মাত্রায় উৎপাদন করে এবং গুণগত মানসম্পন্ন আলু বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করা সম্ভব।

আলু উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ ও রপ্তানি–সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান এক ছাদের নিচে জড়ো হওয়ায় এটি ব্যবসায়ী-দর্শনার্থীদের জন্য পণ্যটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার এক বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। মালয়েশিয়ায় সুপারশপে অংশীদারত্ব থাকা বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি এই মেলা থেকে আলুর বীজ থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ ও উৎপাদিত পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন, যা তাঁকে বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

আলু উৎসব কেবল একটি মেলা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের কৃষিখাতে আলুর বাণিজ্যিক বিপ্লবের সূচনা। এই উৎসবের মাধ্যমে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ আলুর বহুবিধ ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পেরেছে, তেমনি কৃষি উদ্যোক্তারা রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!