ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা শুধু মাঠের জাদুকরী ড্রিবলিং বা অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্যই বিশ্বজুড়ে অমর হয়ে নেই, বরং খেলাধুলা নিয়ে তার স্পষ্টভাষী এবং বিস্ফোরক মন্তব্যের কারণেও তিনি সবসময় আলোচনার শীর্ষে থাকতেন। মনের মধ্যে যা থাকতো, তা অকপটে মুখে বলে দিতেন এই আর্জেন্টাইন তারকা। এবার ২০১৮ সালে দেওয়া তার এমনই একটি পুরোনো মন্তব্য ২০২৬ বিশ্বকাপের চলমান প্রেক্ষাপটে আবারও নতুন করে লাইমলাইটে চলে এসেছে। ফুটবল ভক্তরা অবাক হয়ে দেখছেন, ম্যারাডোনা ৮ বছর আগে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তা আজ কীভাবে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ও বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে ম্যারাডোনার উদ্বেগ
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ চলাকালীন এক সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ বা খেলাটিকে স্রেফ ব্যবসার হাতিয়ার বানানোর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।
ম্যারাডোনা বলেছিলেন, মার্কিন ক্রীড়া সংস্কৃতির করপোরেট প্রভাব ফুটবলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং আবেগ স্তব্ধ করে দিতে পারে। বর্তমান ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচ চলাকালীন ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা খেলোয়াড়দের পানি পানের বিরতির সময় যেভাবে ধুমধাম টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে, তার সঙ্গে ম্যারাডোনার সেই আশঙ্কার হুবহু মিল খুঁজে পাচ্ছেন ফুটবলপ্রেমীরা। অনেকে বলছেন, ম্যারাডোনা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন ফুটবলকে পুঁজি করে কীভাবে ব্যবসার ফাঁদ পাতা হবে।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেই গোপন প্রস্তাবের স্মৃতিচারণ
ম্যারাডোনা তার সাক্ষাৎকারে ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সেই বিশ্বকাপের আগে মার্কিন আয়োজকেরা ফিফার কাছে ফুটবল ম্যাচকে ৪৫ মিনিটের দুটি হাফের পরিবর্তে ২৫ মিনিট করে মোট চারটি কোয়ার্টারে ভাগ করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন বাস্কেটবল বা এনএফএল-এর মতো ম্যাচের মাঝে বারবার বিজ্ঞাপন প্রচার করার সুযোগ তৈরি করা, যাতে কোটি কোটি ডলার আয় করা যায়। যদিও সে সময় ফুটবলের ঐতিহ্য রক্ষার্থে ফিফা সেই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়, তবে বর্তমান বিশ্বকাপে বিরতির সময় বাণিজ্যিক সম্প্রচারের হিড়িক দেখে ম্যারাডোনার সেই মন্তব্যই আজ বারবার ফুটবল অঙ্গনে ঘুরেফিরে আসছে।
মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে কটাক্ষ
২০২৬ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হিসেবে যখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল, তখনও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। বিশেষ করে মেক্সিকোর ফুটবল সক্ষমতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে ম্যারাডোনা বলেছিলেন:
“মেক্সিকো এই যৌথ আয়োজন পাওয়ার একেবারেই যোগ্য নয়। তারা যখনই জার্মানি বা ব্রাজিলের মতো কোনো শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হয়, সেখানেই তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে যায়। তারা বড় কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করার মতো পরিপক্ব নয়।”
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ফুটবল সংস্কৃতি নিয়েও ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি ম্যারাডোনা। তার ভাষ্য ছিল, আমেরিকার মানুষের মনে ফুটবল নিয়ে কোনো প্রকৃত আবেগ বা ভালোবাসা নেই, তারা কেবল এটিকে বিনোদন মনে করে। আর শীতপ্রধান দেশ কানাডাকে নিয়ে রসিকতা করে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, “কানাডিয়ানরা বড়জোর ভালো স্কিয়ার (Skiers) হতে পারে, ফুটবল খেলা তাদের কাজ নয়।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন বিতর্ক
ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও ২০২৬ বিশ্বকাপে ঘটে যাওয়া নানা নিয়মের পরিবর্তন এবং ফুটবলের বাণিজ্যিক রূপ দেখে ভক্তরা তাকে আবারও স্মরণ করছেন। ম্যারাডোনার সেই পুরোনো ভিডিও এবং সাক্ষাৎকারগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল ভাইরাল। ফুটবল ভক্তদের একাংশের মতে, ম্যারাডোনা ফুটবলের ঐতিহ্যকে ভালোবাসতেন বলেই এই কঠিন সত্যগুলো সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন, যা আজ বাস্তব রূপ নিয়েছে।
ম্যারাডোনা আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রতিটি কথা আজও ফুটবল বিশ্বে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা ২০২৬ বিশ্বকাপ আরও একবার প্রমাণ করে দিল। ফুটবলের আবেগ কি সত্যিই করপোরেট দুনিয়ার কাছে হেরে যাচ্ছে? ম্যারাডোনার এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে আপনার কী রায়? কমেন্ট করে আমাদের জানান এবং ফুটবল বিশ্বের এমন সব রোমাঞ্চকর খবর সবার আগে পেতে আমাদের পেজে লাইক দিয়ে পাশেই থাকুন।








