২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হলো ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বসেরা ফুটবলাররা এই সোনালী ট্রফিটি জয়ের জন্য নিজেদের উজাড় করে দেন। তবে ২০২৬ সালের এই মহাযজ্ঞ শুধু মাঠের গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফি জয়ের লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আজকের ফুটবলাররা একেকজন বিশ্বব্যাপী মহাতারকা, যাদের রয়েছে কোটি কোটি অনুসারী।
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া মূলত খেলোয়াড় ও ভক্তদের মধ্যকার চিরাচরিত সম্পর্ককে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তারকাদের একটিমাত্র পোস্ট এখন যেকোনো টেলিভিশন বা সংবাদ মাধ্যমের চেয়েও দ্রুত কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। স্বাভাবিকভাবেই ফুটবলারদের এই তুমুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে মুখিয়ে থাকে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো। এমনকি বর্তমান বিশ্বের কয়েকজন ফুটবলারের সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার সংখ্যা বিশ্বের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি! ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আলোয় চলুন দেখে নেওয়া যাক মাঠের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তোলা শীর্ষ ১০ ফুটবলারের তালিকা।
১. ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল): অপরাজিত কিংবদন্তি
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এবং ব্র্যান্ড ভ্যালুর দিক থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে সবার শীর্ষে অবস্থান করছেন। বিশ্বের কোনো ক্রীড়াবিদই আজ পর্যন্ত রোনালদোর মতো এত বিশাল অনলাইন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারেননি।
- মোট সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার: ১.১ বিলিয়ন (১১০ কোটি) এরও বেশি
- ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার: ৬৬৫ মিলিয়নেরও বেশি
- বার্ষিক এন্ডোর্সমেন্ট আয়: ৬০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল মাঠে রাজত্ব করা সিআরসেভেন (CR7) নাইকি, বাইন্যান্স, ক্লিয়ার শ্যাম্পু এবং নিজের নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘CR7’ থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার আয় করছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে তিনি মাঠে কতটা ঝলক দেখাবেন তা সময় বলে দেবে, তবে জনপ্রিয়তার সিংহাসনটা যে তারই, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
২. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): ফুটবল জাদুকর
রোনালদোর ঠিক পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের আরেক মহাতারকা লিওনেল মেসি। ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার পর মেসির জনপ্রিয়তা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।
- মোট সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার: ৮০ কোটির বেশি
- ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার: ৫০.৫ কোটি থেকে ৫১ কোটি প্রায়
- বার্ষিক এন্ডোর্সমেন্ট আয়: ৫ কোটি ডলারের বেশি
কিংবদন্তি মেসির সাথে বিশ্বের নামী-দামী ব্র্যান্ড যেমন অ্যাডিডাস, পেপসি, অ্যাপল এবং হার্ড রকের মতো বড় বড় কোম্পানির এন্ডোর্সমেন্ট চুক্তি রয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপই মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের তীক্ষ্ণ নজর থাকবে এই ফুটবল জাদুকরের দিকে।
৩. নেইমার জুনিয়র (ব্রাজিল): সাম্বা জাদুকর
মাঝেমধ্যে চোট বা ইনজুরি নেইমারের খেলার গতি কিছুটা কমিয়ে দিলেও, তার মাঠের বাইরের তারকাখ্যাতিতে বিন্দুমাত্র জং ধরেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের ক্রেজ এখনো আকাশচুম্বী।
- মোট সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার: ৪৫০ মিলিয়নেরও বেশি
- ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার: ২৩০ মিলিয়নেরও বেশি
- বার্ষিক এন্ডোর্সমেন্ট আয়: ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি
অনলাইনে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করা নেইমার বর্তমানে পুমা (Puma) এবং রেড বুলের মতো জায়ান্ট ব্র্যান্ডগুলোর গ্লোবাল ফেস হিসেবে কাজ করছেন।
৪. কিলিয়ান এমবাপে (ফ্রান্স): ভবিষ্যতের বিশ্বসেরা
তরুণ প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যে কিলিয়ান এমবাপে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিকের সুবাদে বিশ্বজুড়ে তার এক বিশাল ভক্তকুল তৈরি হয়েছে।
- মোট সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার: ২০০ মিলিয়নেরও বেশি
- ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার: ১২Snapshot৫ মিলিয়নেরও বেশি
- বার্ষিক এন্ডোর্সমেন্ট আয়: ২৫ মিলিয়ন থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার+
বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড নাইকি, হাবলো (Hublot) এবং ওকলির মতো বিশ্বখ্যাত বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর সাথে অংশীদারত্ব করছেন।
৫. ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল): গতি আর দক্ষতার প্রতীক
রিয়াল মাদ্রিদ এবং ব্রাজিলের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা ও প্রভাবশালী খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন।
- মোট সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার: ৮০ মিলিয়নেরও বেশি
- ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার: ৫৫ মিলিয়নেরও বেশি
- বার্ষিক এন্ডোর্সমেন্ট আয়: ১৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি
তার অবিশ্বাস্য গতি ও ড্রিবলিং দক্ষতা নাইকিসহ বেশ কয়েকটি বড় স্পনসরকে আকৃষ্ট করেছে। দিন দিন তার ফলোয়ার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
ফুটবল বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ সোশ্যাল মিডিয়া তারকাদের এক নজরে দেখে নিন:
| খেলোয়াড় ও দেশ | মোট সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার | ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার | আনুমানিক এন্ডোর্সমেন্ট আয় | প্রধান স্পনসর/ব্র্যান্ড |
| ৬. মোহাম্মদ সালাহ (মিশর) | ৭০ মিলিয়নের বেশি | ৪২ মিলিয়নের বেশি | $১২M – $১৫M | অ্যাডিডাস, পেপসি, ভোডাফোন |
| ৭. জুড বেলিংহাম (ইংল্যান্ড) | ৬০ মিলিয়নেরও বেশি | ৪০ মিলিয়নেরও বেশি | $১০M – $১৫M | অ্যাডিডাস |
| ৮. আর্লিং হালান্ড (নরওয়ে) | ৭০ মিলিয়নের বেশি | ৪০ মিলিয়নেরও বেশি | $১৫ মিলিয়নের বেশি | নাইকি, বিটস বাই ড্রে |
| ৯. লামিন ইয়ামাল (স্পেন) | ৫০ মিলিয়নের বেশি | ৩৫ মিলিয়নের বেশি | $৮M – $১২M | বার্সেলোনা ও স্পেনের বিভিন্ন ব্র্যান্ড |
| ১০. হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড) | ৪৫ মিলিয়নেরও বেশি | ১৮ মিলিয়নেরও বেশি | $৮M – $১০M | স্কেচার্স, ক্যাডবেরি |
কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় ফুটবলারদের এই আধিপত্য?
আজকের দিনে একজন ফুটবলার শুধুমাত্র মাঠের খেলোয়াড় নন, তিনি নিজেই একটি বড় ব্র্যান্ড। ভক্তরা কেবল তাদের গোল দেখতে চান না, বরং তাদের প্রিয় তারকার দৈনন্দিন জীবন, ট্রেনিং সেশনের নেপথ্যের গল্প এবং পারিবারিক মুহূর্তগুলোও দেখতে চান।
বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপ যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন এই সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়াররাই দলগুলোর এবং খেলোয়াড়দের বাণিজ্যিক মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে। হ্যারি কেইনের মতো অভিজ্ঞ অধিনায়ক থেকে শুরু করে মাত্র ২২ বছর বয়সী জুড বেলিংহাম কিংবা কিশোর তারকা লামিন ইয়ামাল সবাই এখন ডিজিটাল দুনিয়ায় রাজত্ব করছেন। তবে এই তালিকার শীর্ষ দুই স্থান অর্থাৎ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসির যে বিশাল সাম্রাজ্য, তা ছুঁতে নতুন প্রজন্মের তারকাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।








