আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম। মূলত মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া দামের কারণে মূল্যবান এই ধাতুর মূল্যে পতন লক্ষ্য করা গেছে। তেলের উচ্চ মূল্যের কারণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) সুদের হার আরও বাড়াতে পারে বিনিয়োগকারীদের এমন পূর্বাভাসের পরই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে।
রয়টার্সের সূত্র মতে, বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশ সতর্ক পা ফেলছেন। যার সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে স্বর্ণ ও ডলারের বাজারে। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক কেন বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমছে এবং এর পেছনে কী কী কারণ রয়েছে।
স্পট গোল্ড ও ফিউচার মার্কেটে স্বর্ণের বর্তমান অবস্থা
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম স্পট মার্কেট (তাত্ক্ষণিক বাজার) এবং ফিউচার মার্কেট (অগ্রিম সরবরাহ চুক্তি) উভয় ক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে।
১. স্পট গোল্ডের দাম কমেছে
আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা আকরিক স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে গেছে। ফলে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪,৫Mj.০৬ ডলারে নেমে এসেছে। চলতি সপ্তাহে এখন পর্যন্ত হিসাব করলে দেখা যায়, স্বর্ণের সামগ্রিক দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
২. মার্কিন গোল্ড ফিউচার্স
আগামী জুন মাসে সরবরাহের চুক্তি বা ফিউচার মার্কেট অনুযায়ী, মার্কিন স্বর্ণের দামও শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। ফিউচার মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম এখন ৪,৫২২.৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পতন সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
ডলারের শক্তিশালী অবস্থান ও স্বর্ণের বাজারের সম্পর্ক
স্বর্ণের দাম কমার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মার্কিন ডলারের টানা উত্থানকে। বর্তমানে মার্কিন ডলারের সূচক (Dollar Index) গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে।
পণ্য বাজারবিষয়ক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘মারেক্স’-এর নামকরা বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেয়ার এই বিষয়ে জানিয়েছেন, মূলত শক্তিশালী ডলারের কারণেই স্বর্ণের দাম নিচের দিকে নামছে। আর বিশ্বজুড়ে চলমান উচ্চ সুদহারের কারণেই ডলারের অবস্থান এমন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হয়। ফলে ডলারের দাম যখন বেড়ে যায়, তখন অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী ক্রেতাদের জন্য ডলারের মূল্যে স্বর্ণ কেনা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এর ফলে বাজারে স্বর্ণের চাহিদা কিছুটা কমে যায়, যা দাম কমাতে বাধ্য করে।
ইরান পরিস্থিতি ও তেলের বাজারের উত্তাপ
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিও স্বর্ণের বাজারে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা নিয়ে কিছুটা ইতিবাচক বা ‘ভালো লক্ষণ’ দেখার কথা জানিয়েছেন। তবে এখনো কিছু বড় বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে অমিল রয়ে গেছে।
বিশেষ করে তেহরানের ইউরেনিয়াম মজুত এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনার মূল বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই শান্তি আলোচনা কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বৃদ্ধির পূর্বাভাস
তেলের এই চড়া দাম বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। আর এই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য উচ্চ সুদহার বজায় রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- বিনিয়োগকারীদের আচরণ: সাধারণত স্বর্ণকে মুদ্রাস্ফীতিজনিত লোকসান এড়ানোর একটি নিরাপদ মাধ্যম (Safe Haven) হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু যখন ব্যাংকে সুদের হার বাড়ে, তখন মানুষ স্বর্ণের চেয়ে ব্যাংকে বা বন্ডে বিনিয়োগ করতে বেশি পছন্দ করে। কারণ স্বর্ণ নিজের কাছে রাখলে কোনো ডিভিডেন্ড বা বাড়তি সুদ পাওয়া যায় না। তাই সুদহার বাড়লে স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রাকৃতিকভাবেই কমে যায়।
- ফেডওয়াচ টুলের পূর্বাভাস: সিএমই গ্রুপের ‘ফেডওয়াচ’ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বাজার বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে বছরের শেষ নাগাদ ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই সুদের হার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ।
ট্রাম্প প্রশাসন ও ফেডের নতুন নেতৃত্ব: সবার নজর এখন হোয়াইট হাউসে
স্বর্ণের বাজারের আগামী দিনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে মার্কিন রাজনীতির একটি বড় ভূমিকা থাকবে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে কেভিন ওয়ারশ-কে ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।
ফেডারেল রিজার্ভের নতুন এই নেতৃত্বের অধীনে মার্কিন মুদ্রানীতি বা সুদের হারের সিদ্ধান্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। কেভিন ওয়ারশ যদি সুদের হার কমানোর বা বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দেন, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আবারও বড় ধরনের ওঠানামা করতে পারে।








