বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত নানা পরিবর্তন ঘটে চলেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মূল্যবান ধাতু বিশেষ করে স্বর্ণের বাজারে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে এক বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে, যা গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। ডলারের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কর্তৃক সুদের হার বাড়ানোর জোরালো সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় পতনের কারণে স্বর্ণের বাজার এখন তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বড় বড় বিনিয়োগকারী সবাই এখন স্বর্ণের বাজারের এই আকস্পিক পরিবর্তনে নড়েচড়ে বসেছেন।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের বর্তমান দামের চিত্র
বুধবার (২৪ জুন) ভোর সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা সদ্য উত্তোলিত প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১ শতাংশ কমে ৪,০৬৭.৫১ ডলারে নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি গত ১১ জুনের পর স্বর্ণের দামের সর্বনিম্ন পর্যায়। শুধু স্পট গোল্ডই নয়, ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত বা আগস্ট ডেলিভারির মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারের দামও বড় ধাক্কা খেয়েছে। আগস্টের মার্কিন স্বর্ণ ফিউচার ১.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,০৮৩.৯০ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই আকস্মিক পতন প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাজারের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা এখন স্বর্ণের চেয়ে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
স্বর্ণের দাম কমার প্রধান কারণসমূহ
হঠাৎ করে স্বর্ণের বাজারে কেন এই বড় ধস নামল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত তিনটি বড় কারণ এই দরপতনের পেছনে কাজ করছে। নিচে এই কারণগুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো:
১. মার্কিন ডলারের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে মার্কিন ডলারের মান এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। নিয়ম অনুযায়ী, যখন ডলারের মান শক্তিশালী হয়, তখন অন্যান্য দেশের মুদ্রা ব্যবহারকারী ক্রেতাদের জন্য ডলারের মাধ্যমে স্বর্ণ কেনা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা সাময়িকভাবে কমে যায়, যা দাম কমিয়ে দিতে বাধ্য করে।
২. ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা
আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) যদি সুদের হার বৃদ্ধি করে, তবে বাজারে নগদ টাকার সরবরাহ কমে যায় এবং বন্ডের মুনাফা বা ইয়িল্ড বৃদ্ধি পায়। সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন যে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরে তিন দফা সুদের হার বাড়াতে পারে। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও মানুষ ভাবছিল সুদের হার হয়তো মাত্র একবার বাড়ানো হবে। সুদের হার বাড়লে মানুষ স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদে বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে বা সরকারি বন্ডে টাকা রাখা নিরাপদ মনে করে। কারণ স্বর্ণ নিজের কাছে রাখলে কোনো নিয়মিত লভ্যাংশ বা সুদ পাওয়া যায় না।
৩. বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম পতন
জ্বালানি তেলের দামের সাথে স্বর্ণের দামের একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তেলের দাম কমলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমে আসে। আর মূল্যস্ফীতি কমলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে আর “নিরাপদ আশ্রয়” বা সেফ হ্যাভেন হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন মনে করেন না। তেলের বাজারে সাম্প্রতিক মন্দাভাব স্বর্ণের বাজারকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্বর্ণের বাজার
স্বর্ণের দামের ওপর বিশ্ব রাজনীতির বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি বড় প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক স্বর্ণের বাজারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নিয়েছে। এই দাবির পর বিশ্ববাজারে যুদ্ধের যে একটি প্রচ্ছন্ন ভয় ছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হয়। যদিও তেহরান বা ইরান সরকার এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে যে তারা আলোচনা পরিপন্থী কোনো ছাড় দেয়নি, তবুও দুই দেশের মধ্যে যে একটি ভঙ্গুর বা নাজুক শান্তি চুক্তি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে নতুন জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া বিদেশে আটকে থাকা বা জব্দ থাকা ইরানি তহবিলের ব্যবহার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছু মতবিরোধ eastbound রয়ে গেছে।
বাজার বিশ্লেষক ইলিয়া স্পিভাকের মতে, যুদ্ধজনিত কারণে বাজারে যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। এখন বিনিয়োগকারীদের মূল মনোযোগ চলে গেছে মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ সুদের হারের দিকে। যুদ্ধ পরিস্থিতি শিথিল হওয়ায় বন্ডের দাম কমছে, যার ফলে বন্ডের মুনাফা বা ইয়িল্ড বাড়ছে। এর ফলে ডলার শক্তিশালী হচ্ছে এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই স্বর্ণের দাম হ্রাস পাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছিল, তখন স্বর্ণের দাম চূড়ায় উঠেছিল। কিন্তু তারপর থেকে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ২৩ শতাংশ কমে গেছে।
অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও মন্দা
স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ার এই হাওয়া লেগেছে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রূপা, প্লাটিনাম এবং প্যালাডিয়ামের দামেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে অন্যান্য ধাতুর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে করা হলো:
- স্পট সিলভার (রূপা): দাম ০.৯% কমে প্রতি আউন্স ৬১.৪৪ ডলারে নেমেছে।
- প্লাটিনাম: আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ০.৮% কমে ১,৬৩৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
- প্যালাডিয়াম: এই মূল্যবান ধাতুর দামও ০.৮% কমে ১,২২৭.৪১ ডলারে নেমে এসেছে।
উপরের তথ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সামগ্রিকভাবে পুরো ধাতু বাজারই এখন এক ধরনের বড় সংশোধনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি এড়াতে ধাতব বাজার থেকে তাদের পুঁজি তুলে নিচ্ছেন এবং ডলার বা বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন।
সাধারণ ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ
যারা সাধারণ ক্রেতা বা গহনা তৈরি করতে চান, তাদের জন্য বিশ্ববাজারের এই পতন একটি বড় সুসংবাদ হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে স্থানীয় বাজারেও স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়। তবে মনে রাখতে হবে, স্থানীয় বাজারে দাম কমা বা বাড়া সম্পূর্ণ নির্ভর করে স্থানীয় জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ডলারের বিনিময় হারের ওপর। অন্যদিকে, যারা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারী, তাদের জন্য এটি একটি ভালো সুযোগ হতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, দাম যখন অনেক কমে যায়, তখন তা পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে যেকোনো বিনিয়োগের আগে বিশ্ববাজারের ডলারের গতিবিধি এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের দিকে কড়া নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের এই দুই সপ্তাহের সর্বনিম্ন পতন সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা যতদিন বজায় থাকবে, ততদিন স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের লাফ দেওয়ার সম্ভাবনা কম। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক চুক্তি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের দামের নতুন মোড় নির্ধারিত হবে। সাধারণ ক্রেতা ও সচেতন বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের চোখ রাখতে হবে প্রতিদিনের অর্থনৈতিক খবরাখবরের ওপর।








