জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া প্রশাসনিক অস্থিরতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভেতরের দ্বন্দ্ব, শিক্ষকদের পারস্পরিক বিরোধ এবং রেজিস্ট্রার ও অর্থ পরিচালকের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশের মতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ফলেই আজকের এই চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
রেজিস্ট্রার নূর হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ নূর হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ক্যাম্পাসে আলোড়িত হচ্ছে।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষক ও কর্মচারীদের অভিযোগগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- মানসিক টর্চার সেল: অভিযোগ রয়েছে, রেজিস্ট্রারের কক্ষটি যেন একটি মানসিক টর্চার সেলে পরিণত হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে ইচ্ছামতো দুর্ব্যবহার করা হয়।
- সিএসই বিভাগে বিতর্কিত নিয়োগ: বিশেষ করে সিএসই (CSE) বিভাগে একটি বিতর্কিত নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, বিভাগে তালা দেওয়া এবং বিভিন্ন কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক সদস্য ড. তানজিম উদ্দিন আহমেদও গণমাধ্যমে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
- পরীক্ষা দপ্তরে স্থবিরতা: রেজিস্ট্রারের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর পরিচালনার কারণে প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণে জটিলতা, ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে একাধিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারার ঘটনাটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার বড় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
টিএ-ডিএ ও ভাড়াকৃত গাড়ি নিয়ে বড় আর্থিক অনিয়ম
সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নিয়োগ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ কার্যক্রমের নামে ৬০ লক্ষ টাকারও বেশি কেবল টিএ-ডিএ (TA-DA) ও সম্মানি বাবদ উত্তোলন করা হয়েছে রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে।
ক্যাম্পাসে যখন চালক সংকট দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস বন্ধ রাখা হতো, ঠিক সেই সময়ে রেজিস্ট্রারের জন্য লক্ষাধিক টাকা খরচ করে ভাড়াকৃত গাড়ি চালানো হতো, যা বিশ্ববিদ্যালয়েরই নিযুক্ত গাড়িচালক চালাতেন।
এছাড়াও, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও প্রতি সপ্তাহেই তিনি ঢাকায় পরিবারের সাথে গিয়েও শুক্র ও শনিবার ঢাকাস্থ গেস্ট হাউসে বিভিন্ন কাজ দেখিয়ে অবৈধভাবে টিএ-ডিএ উত্তোলন করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অপপ্রচারের নিন্দা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, সাবেক প্রশাসনের সময় ক্যাম্পাসে বিভাজন, বৈষম্য ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার প্রভাব এখনও বিদ্যমান। বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অস্বচ্ছতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি রেজিস্ট্রার ও অর্থ পরিচালকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন শিক্ষকরা। যদি সত্যিই কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রমাণ সাপেক্ষে তদন্ত ও নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে হেনস্তা করা, জোরপূর্বক পদত্যাগ আদায় বা শারীরিক লাঞ্ছনার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তি রেজিস্ট্রার ও সাংবাদিক সমিতির যোগসাজশে অপপ্রচার ও মানহানি করছে বলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষকরা। এই বিষয়ে মাননীয় উপাচার্যের কাছে ছুটির পর লিখিতভাবে প্রতিকার চাওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সুশাসন ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থে এবং একটি সুন্দর একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আল মামুন সরকারসহ সচেতন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে:
“জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক বলয়ের স্বার্থরক্ষার জায়গা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান।”








