হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeব্যবসা ও শিল্পবিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ছড়িয়ে দিতে টাঙ্গাইলে এক্সপোর্ট সেবার বিশেষ প্রশিক্ষণ: নতুন...
spot_img

বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ছড়িয়ে দিতে টাঙ্গাইলে এক্সপোর্ট সেবার বিশেষ প্রশিক্ষণ: নতুন দিগন্তের সূচনা

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে হাজারো ঐতিহ্যবাহী পণ্য। বিশেষ করে আমাদের তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প এবং কুটির শিল্পের কদর বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সঠিক নির্দেশনার অভাবে গ্রামের প্রান্তিক উদ্যোক্তারা তাদের এই অমূল্য পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে পারেন না। ঠিক এই সমস্যাটি সমাধানের লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে দেশের অন্যতম রপ্তানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এক্সপোর্ট সেবা’ (Export Sheba)।

সম্প্রতি টাঙ্গাইলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং ‘এক্সপোর্ট সেবা’র পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা। টাঙ্গাইলের বিখ্যাত পাথরাইল তাঁতবস্ত্র ক্লাস্টারের সহযোগিতায় আয়োজিত এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিশ্বমানের রপ্তানিকারক হিসেবে গড়ে তোলা।

টাঙ্গাইলে রপ্তানি প্রশিক্ষণ: একটি যুগোপযোগী উদ্যোগ

গত ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু হয়ে ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত টানা তিন দিনব্যাপী চলে এই নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মশালা। টাঙ্গাইল জেলাটি বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের জন্য ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত। এখানকার শাড়ির সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রয়েছে। কিন্তু সরাসরি বায়ার বা ক্রেতা না পাওয়ার কারণে এখানকার তাঁতীরা অনেক সময় তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

এই সংকট দূর করতেই এসএমই ফাউন্ডেশন এবং এক্সপোর্ট সেবা যৌথভাবে এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাতে-কলমে শেখানো হয় কীভাবে নিজেদের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে হয়। এটি নিছক কোনো তাত্ত্বিক ক্লাস ছিল না, বরং সরাসরি বায়ার খোঁজা থেকে শুরু করে পণ্য জাহাজীকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

প্রশিক্ষণের মূল বিষয়বস্তুসমূহ

তিন দিনব্যাপী এই কর্মশালায় উদ্যোক্তাদের রপ্তানি বাণিজ্যের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো অত্যন্ত সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

১. সঠিক বাজার নির্বাচন: টাঙ্গাইলের শাড়ির চাহিদা কোন দেশে বেশি এবং সেখানে কীভাবে পণ্য পাঠানো যাবে।

২. বায়ার বা ক্রেতা খোঁজার কৌশল: ইন্টারনেটের মাধ্যমে বা আন্তর্জাতিক মেলায় কীভাবে বিদেশি ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করতে হয়।

৩. ডকুমেন্টেশন ও ব্যাংকিং: এলসি (LC), ইনভয়েস এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাগজপত্রের সঠিক ব্যবহার।

৪. প্যাকেজিং ও লজিস্টিকস: আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কীভাবে পণ্য প্যাকেট করতে হয় এবং শিপমেন্ট করতে হয়।

৫. কমপ্লায়েন্স ইস্যু: বিদেশের বাজারে পণ্য পাঠাতে হলে কী কী আইনকানুন মানতে হয়।

এক্সপোর্ট সেবা: উদ্যোক্তাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী

বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে ‘এক্সপোর্ট সেবা’ বর্তমানে একটি আস্থার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জাহিদ হোসেনের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু। মূলত বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের রপ্তানি বাণিজ্যের জটিল ও কঠিন পথকে সহজ করাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল মন্ত্র।

অনেক সময় দেখা যায়, একজন উদ্যোক্তার কাছে চমৎকার একটি পণ্য আছে, কিন্তু তিনি জানেন না সেটি কীভাবে বিদেশে পাঠাবেন। ভাষাভীতি, আইনি জটিলতা এবং বায়ারের সাথে যোগাযোগের অভাবে অনেকেই পিছিয়ে যান। ‘এক্সপোর্ট সেবা’ ঠিক এই জায়গাটিতেই কাজ করছে। তারা উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সলিউশন’ (One-Stop Solution) হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, পণ্য প্রস্তুত থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে পৌঁছানো পর্যন্ত সব ধরনের সহযোগিতা তারা দিয়ে থাকে।

বিনিয়োগের নতুন সুযোগ: শরিয়াহ-সম্মত সমাধান

ব্যবসা বড় করতে বা বিদেশে পণ্য পাঠাতে গেলে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মূলধন বা টাকা। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই ব্যাংকের চড়া সুদের ঋণের ভয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন না। এই সমস্যার সমাধানেও এগিয়ে এসেছে ‘এক্সপোর্ট সেবা’।

সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ‘biniyog.io’-এর সাথে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে। এটি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বিশাল সুখবর। এর মাধ্যমে এখন থেকে রপ্তানিমুখী ব্যবসাগুলো শরিয়াহ-সম্মত উপায়ে বিনিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ, সুদের ঝামেলা ছাড়াই হালাল উপায়ে বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসা বড় করার সুযোগ তৈরি হলো। টাঙ্গাইলের প্রশিক্ষণেও এই বিষয়টি নিয়ে উদ্যোক্তাদের বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়, যা তাদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছে।

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প ও আন্তর্জাতিক বাজার

টাঙ্গাইলের পাথরাইল এলাকাটি মূলত তাঁতবস্ত্রের জন্য বিখ্যাত। এখানকার শাড়ির বুনন, ডিজাইন এবং গুণমান অদ্বিতীয়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সনাতন পদ্ধতির ব্যবসার বাইরে এসে আধুনিক মার্কেটিং কৌশল জানতে হবে।

এই প্রশিক্ষণে মেন্টরশিপের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের শেখানো হয়েছে কীভাবে তারা তাদের পণ্যকে একটি ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। শুধুমাত্র শাড়ি হিসেবে বিক্রি না করে, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ ট্যাগ লাগিয়ে কীভাবে বিশ্বজুড়ে এর ব্র্যান্ডিং করা যায়, সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি টাঙ্গাইলের এই ক্লাস্টার থেকে সরাসরি রপ্তানি শুরু করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।

কেন এই প্রশিক্ষণ জরুরি ছিল?

আমাদের দেশে রপ্তানি আয় মূলত গার্মেন্টস শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে হলে পণ্য বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। টাঙ্গাইলের শাড়ি, নকশিকাঁথা, চামড়াজাত পণ্য কিংবা পাটজাত পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে।

কিন্তু তথ্যের অভাবে প্রান্তিক পর্যায়ের উৎপাদকেরা সেই সুযোগ নিতে পারছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে তারা লাভের মুখ কম দেখেন। ‘এক্সপোর্ট সেবা’র এই প্রশিক্ষণের ফলে এখন উদ্যোক্তারা সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের সাথে কথা বলতে পারবেন। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের টাকা দেশেই আসবে।

অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়া

প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া স্থানীয় একজন তাঁত ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা আগে ভাবতাম বিদেশে পণ্য পাঠানো মানে অনেক ঝামেলার কাজ। কিন্তু এই তিন দিনের প্রশিক্ষণে আমাদের সেই ভয় কেটে গেছে। এখন আমরা জানি কীভাবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বায়ার খুঁজতে হয় এবং কীভাবে নিরাপদে পণ্য পাঠাতে হয়। এক্সপোর্ট সেবাকে ধন্যবাদ এমন সহজ ভাষায় আমাদের বোঝানোর জন্য।”

আগামীর সম্ভাবনা

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি এখন আর শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি আমাদের আবেগের নাম। এক্সপোর্ট সেবা এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের এই যৌথ উদ্যোগ সেই আবেগকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। টাঙ্গাইলের এই সফল প্রশিক্ষণের পর দেশের অন্যান্য জেলাতেও এমন কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি প্রতিটি জেলার বিখ্যাত পণ্যগুলোকে এভাবে চিহ্নিত করে ক্লাস্টারভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই এশিয়ার অন্যতম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হবে। আর এই যাত্রায় ‘এক্সপোর্ট সেবা’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।


শীতের কুয়াশাঘেরা টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি হয়তো মাত্র তিন দিনের ছিল, কিন্তু এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এটি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের চোখে নতুন স্বপ্ন বুনে দিয়েছে যে স্বপ্নের নাম বিশ্বজয়। আমাদের প্রত্যাশা, খুব শীঘ্রই টাঙ্গাইলের শাড়ি বিশ্বের বড় বড় ফ্যাশন শোরুমে গর্বের সাথে প্রদর্শিত হবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!