হাড়কাঁপানো শীতের রাত। সবাই যখন উষ্ণতার খোঁজে ঘরের কোণে আশ্রয় নিচ্ছে, ঠিক তখনই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দেখা মিললো এক নির্মম ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। কনকনে শীতের রাতে অসুস্থ দুই সন্তানকে সড়কের পাশে ফেলে রেখে চলে গেছেন জন্মদাতা মা-বাবা। তবে রক্তের সম্পর্ক যখন বিশ্বাসঘাতকতা করলো, তখন মানবতার হাত বাড়িয়ে দিলেন এক অপরিচিত সিএনজি চালক।
গত রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের মাজারগেট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। চার বছর বয়সী বোন আয়েশা তার দুই বছর বয়সী বাকপ্রতিবন্ধী ছোট ভাইকে আগলে ধরে শীতে কাঁপছিল এই দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখা দায়।
সিএনজি চালক মহিম উদ্দিনের মানবিকতা
সড়কের পাশে অসহায় অবস্থায় বসে থাকা এই দুই শিশুকে প্রথম নজরে আসে মহিম উদ্দিন নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের। তিনি জানান, সন্ধ্যার পর মাজারগেট এলাকায় শিশু দুটিকে কাঁপতে দেখে তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি।
মহিম উদ্দিন বলেন, “সন্ধ্যার পরও দুই শিশুকে অসহায় অবস্থায় বসে থাকতে দেখে আমি এগিয়ে যাই। বড় শিশুটির সঙ্গে কথা বলে তাদের দুরবস্থা বুঝতে পারি। কনকনে শীতে তাদের কষ্ট দেখে মানবিক কারণেই তাদের আমার নিজের বাড়িতে নিয়ে আসি।”
পাষণ্ড মা-বাবা ফেলে গেলেও, মহিম উদ্দিন এবং তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তার শিশু দুটিকে পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছেন। শারমিন আক্তার জানান, শিশু দুটি খুবই অসুস্থ ছিল। বিশেষ করে ছোট বাচ্চাটি বাকপ্রতিবন্ধী। রাতে তাদের গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে খাবার খাওয়ানোর পর তারা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তাঁদের ধারণা, শিশুরা অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণেই মা-বাবা এমন নিষ্ঠুর কাজটি করেছেন।
শিশুকন্যা আয়েশার ভাষ্য ও পরিচয়
উদ্ধার হওয়া চার বছরের শিশু আয়েশা তার আধো আধো বোলে নিজের পরিচয় দিয়েছে। তার দেওয়া তথ্যমতে, তাদের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার মৌলভীর দোকান এলাকায়। বাবার নাম খোরশেদ আলম এবং মায়ের নাম ঝিনুক আখতার।
আয়েশা জানায়, তাদের মা-বাবার কাছ থেকে এনে এক খালা তাদের এখানে সড়কের পাশে বসিয়ে রেখে চলে যান। যাওয়ার সময় বলে গেছেন, কিছুক্ষণ পরেই তিনি ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই খালা আর ফিরে আসেননি। তীব্র শীতে ছোট ভাই যখন কাঁদছিল, তখন ছোট্ট আয়েশা তাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আনোয়ারা থানা পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আনোয়ারা থানার সাব ইন্সপেক্টর মোমেন জানান, বিষয়টি শোনার পর তিনি ঘটনাস্থলে যান এবং শিশুদের খোঁজখবর নেন। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বিভিন্ন থানায় ছবি ও তথ্য পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানিয়েছেন, এই দুই অবুঝ শিশুকে আপাতত নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “সড়কের পাশে পাওয়া দুই শিশুকে উদ্ধার করে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ‘সেইফহোমে’ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এজন্য পুলিশ প্রশাসন ও সমাজসেবা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।”
পৃথিবীতে বাবা-মায়ের চেয়ে আপন কেউ নেই। কিন্তু সেই বাবা-মা যখন সন্তানের বোঝা মনে করে রাস্তায় ফেলে যান, তখন মানবতা লজ্জিত হয়। তবে মহিম উদ্দিনের মতো মানুষদের কারণেই পৃথিবীটা এখনো সুন্দর।








