হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeআর্ন্তজাতিকমালয়েশিয়ায় ৯০ হাজারের বেশি অবৈধ অভিবাসী আটক, আতঙ্কে প্রবাসীরা
spot_img

মালয়েশিয়ায় ৯০ হাজারের বেশি অবৈধ অভিবাসী আটক, আতঙ্কে প্রবাসীরা

মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের জন্য বছরটি ছিল আতঙ্কের। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ (JIM) বছরজুড়ে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মালয়েশিয়া জুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে ৯০ হাজারের বেশি অবৈধ অভিবাসী আটক করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ দেশের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। এই অভিযানে বাদ পড়েনি বাংলাদেশি নাগরিকরাও। অবৈধভাবে বসবাস, কাজের অনুমতি না থাকা এবং ভিসার অপব্যবহারের কারণে হাজার হাজার বাংলাদেশিকে আটক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন বিভাগের উপ-মহাপরিচালক (অপারেশন) দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি এক বিবৃতিতে এই বিপুল সংখ্যক আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে।

অভিযানের বিশাল পরিসংখ্যান ও তল্লাশি

মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ চলতি বছর আক্ষরিক অর্থেই সারা দেশ চষে বেড়িয়েছে। বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, নির্মাণ সাইট থেকে শুরু করে শপিং মল কোথাও বাদ রাখেনি তারা।

দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি জানান, ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১৩ হাজার ৬৭৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক অভিযানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোট ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪৩ জন বিদেশিকে সন্দেহভাজন হিসেবে থামিয়ে তাদের কাগজপত্র তল্লাশি করেছে।

এই তল্লাশির আওতায় শুধু সাধারণ শ্রমিকরাই ছিলেন না, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এর কার্ডধারী ৫ হাজার ২৯৪ জন ব্যক্তিকেও তল্লাশি করা হয়েছে। ইমিগ্রেশন বিভাগ নিশ্চিত করতে চেয়েছে যে, কেউ যেন শরণার্থী কার্ডের আড়ালে অবৈধ কোনো সুবিধা না নেয় বা কার্ডের অপব্যবহার না করে।

আটকের ধরণ: সরাসরি অভিযান ও হস্তান্তর

৯০ হাজারের বেশি আটকের এই সংখ্যাটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। ইমিগ্রেশন বিভাগ সরাসরি অভিযান চালিয়ে এবং অন্যান্য সংস্থার সহায়তায় এই বিপুল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসীকে আইনের আওতায় এনেছে।

১. সরাসরি আটক: ইমিগ্রেশন পুলিশ সরাসরি অভিযান চালিয়ে স্পট থেকে ৫০ হাজার ৪৭২ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করেছে। এরা মূলত কর্মস্থল, গোপন আস্তানা বা রাস্তায় নথিপত্র বিহীন অবস্থায় ধরা পড়েছে। 

২. অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে হস্তান্তর: দেশের প্রধান প্রবেশপথ (এয়ারপোর্ট, স্থলবন্দর) এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (যেমন পুলিশ বা সিটি কর্পোরেশন) বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে আরও ৪১ হাজার ৩৫৭ জনকে আটক করে ইমিগ্রেশন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে।

সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় একটি রেকর্ড।

কোন দেশের কত নাগরিক আটক?

ইমিগ্রেশন বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আটককৃতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নাগরিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া।

দেশভিত্তিক আটককৃতদের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • ইন্দোনেশিয়া: তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। চলতি বছরে দেশটির ১৫ হাজার ৩৮৫ জন নাগরিককে আটক করা হয়েছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে অনেকেই অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেন।
  • বাংলাদেশ: তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। মোট ১১ হাজার ১০৫ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। এটি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি বড় ধাক্কা এবং উদ্বেগের বিষয়।
  • মিয়ানমার: তৃতীয় স্থানে রয়েছে মিয়ানমার। দেশটির ৯ হাজার ৭৮৯ জন নাগরিক আটক হয়েছেন।
  • ফিলিপাইন: আটক হয়েছেন ৪ হাজার ৩৬৫ জন।
  • পাকিস্তান: পাকিস্তানের নাগরিক আটক হয়েছেন ২ হাজার ৪৯৭ জন।
  • ভারত: ভারতের ১ হাজার ৬৩০ জন নাগরিক আটক হয়েছেন।
  • থাইল্যান্ড: প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডের ১ হাজার ৪৯৩ জন নাগরিক আটক হয়েছেন।
  • চীন: চীনের ১ হাজার ৩৮ জন নাগরিক আটক হয়েছেন।
  • ভিয়েতনাম: ভিয়েতনামের ৯০৯ জন নাগরিক আটক হয়েছেন।
  • নেপাল: নেপালের ৭৬৯ জন নাগরিক আটক হয়েছেন।

এছাড়াও বাকি আটককৃতরা এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

কেন আটক করা হচ্ছে? প্রধান অপরাধসমূহ

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের আটকের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছে ইমিগ্রেশন বিভাগ। প্রবাসীরা অনেক সময় জেনে বা না জেনে এই ভুলগুলো করেন, যার মাসুল দিতে হয় জেল-জরিমানা বা দেশে ফেরত আসার মাধ্যমে।

১. বৈধ কাগজপত্র না থাকা (No Valid Documents): বেশিরভাগ আটককৃতের কাছেই মালয়েশিয়ায় অবস্থানের কোনো বৈধ কাগজপত্র বা পাসপোর্ট ছিল না। অনেকেই অবৈধ পথে দেশে প্রবেশ করেছেন অথবা পাসপোর্ট দালালের কাছে জমা দিয়ে হারিয়ে ফেলেছেন। অভিযানের সময় নিজের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের আটক করা হয়।

২. মেয়াদোত্তীর্ণভাবে অবস্থান (Overstay): অনেকেই টুরিস্ট ভিসা বা স্বল্পমেয়াদী ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে আর ফিরে আসেননি। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তারা লুকিয়ে কাজ করছিলেন। মালয়েশিয়ার আইনে ‘ওভারস্টে’ বা মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থান একটি গুরুতর অপরাধ।

৩. কাজের অনুমতির অপব্যবহার (Misuse of Work Permit): এটি একটি সাধারণ সমস্যা। অনেক শ্রমিকের ‘প্ল্যান্টেশন’ বা কৃষি কাজের ভিসা থাকে, কিন্তু তারা কাজ করেন রেস্টুরেন্ট বা কনস্ট্রাকশন সাইটে। মালয়েশিয়ার আইন অনুযায়ী, যেই সেক্টরের ভিসা, ঠিক সেই সেক্টরেই কাজ করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ভিসা বাতিলসহ আটকের বিধান রয়েছে। প্রাপ্ত অভিযোগ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশি শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এসব কারণে অভিযান চালানো হয়।

নিয়োগকর্তা ও আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

শুধু অবৈধ শ্রমিকই নয়, যারা এসব অবৈধ অভিবাসীদের কাজ দিচ্ছেন বা থাকার জায়গা দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, অবৈধ কাউকে আশ্রয় দেওয়া বা কাজ দেওয়া সমান অপরাধ।

চলতি অভিযানে অবৈধ অভিবাসীদের আশ্রয় ও চাকরি দেওয়ার অভিযোগে বহু মালিককে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় মালয়েশিয়ান নাগরিকই বেশি।

  • স্থানীয় মালয়েশিয়ান মালিক: ২ হাজার ১২ জন।
  • বাংলাদেশি মালিক: ৩৪ জন। (যারা ব্যবসা বা রেস্টুরেন্ট চালাতেন এবং অবৈধ কর্মী রেখেছিলেন)।
  • ইন্দোনেশীয় মালিক: ২১ জন।

এছাড়াও পাকিস্তান, চীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের নাগরিক মালিকরাও এই আটকের তালিকায় রয়েছেন। ইমিগ্রেশন বিভাগ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মালিক যেই হোক না কেন, আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশিদের জন্য উদ্বেগের কারণ

১১ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি আটক হওয়ার ঘটনাটি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর ভীতি সৃষ্টি করেছে। অনেক বাংলাদেশি জমি বিক্রি করে বা ঋণ করে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন আটক হয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে দিন কাটানো এবং পরবর্তীতে শূন্য হাতে দেশে ফেরার আশঙ্কায় তাদের পরিবারগুলো দিশেহারা।

বিশেষ করে যারা ‘রিক্যালিব্রেশন’ বা বৈধ হওয়ার প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন কিন্তু এখনো কাগজপত্র পাননি, তারাও এই অভিযানের মুখে পড়েছেন। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন, আবার এখন ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ধরা পড়ছেন।

ইমিগ্রেশন বিভাগের কঠোর হুঁশিয়ারি

মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন বিভাগের উপ-মহাপরিচালক দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি অভিযানের বিষয়ে কোনো নমনীয়তা দেখাননি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় আপস করা হবে না।

তিনি বলেন, “অবৈধ অভিবাসী নিয়োগ ও আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে যারা আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন বিভাগ কঠোর ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

তিনি আরও জানান, আগামী দিনেও এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে হটস্পট এলাকাগুলো, যেখানে অবৈধ অভিবাসীদের আনাগোনা বেশি, সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ডিটেনশন ক্যাম্প ও পরবর্তী প্রক্রিয়া

যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের বিভিন্ন ডিটেনশন ডিপো বা ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাদের কোনোভাবেই বৈধ হওয়ার সুযোগ নেই, তাদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

তবে এই প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। আটকের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দেশে ফিরতে অনেক সময় মাসের পর মাস লেগে যায়। এছাড়া একবার ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ হয়ে দেশে ফিরলে তারা আর কখনোই বা দীর্ঘ সময়ের জন্য মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

প্রবাসীদের প্রতি পরামর্শ

এই পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। 

১. সব সময় নিজের বৈধ পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিট বা তার কপি সাথে রাখা। 

২. ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা নবায়ন করা। 

৩. যেই ভিসায় গিয়েছেন, সেই সেক্টরেই কাজ করা। 

৪. কোনো অবৈধ পথে বৈধ হওয়ার চেষ্টা না করে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। 

৫. পরিচিত বা অপরিচিত কাউকে অবৈধভাবে নিজের বাসায় আশ্রয় না দেওয়া।


মালয়েশিয়ায় ৯০ হাজার অবৈধ অভিবাসী আটকের ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশটি অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়া একটি বড় শ্রমবাজার। তাই যারা দেশটিতে আছেন বা নতুন করে যেতে চাচ্ছেন, তাদের অবশ্যই দেশটির আইন মেনে চলা উচিত। অন্যথায় স্বপ্নের প্রবাস জীবন এক মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে।

সূত্র: ইমিগ্রেশন বিভাগ, মালয়েশিয়া।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!