ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইসলামি বক্তা ড. জাকির নায়েকের বাংলাদেশ সফর ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। ধর্মপ্রাণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল তাঁর আগমনকে ঘিরে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে আসা হচ্ছে না তাঁর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর সফর অনুমোদন করা সম্ভব নয়। নিরাপত্তা ও নির্বাচন-সংক্রান্ত ব্যস্ততার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দুই দিনের সফরসূচি ছিল জাকির নায়েকের
আগামী ২৮ ও ২৯ নভেম্বর ঢাকায় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসার কথা ছিল ড. জাকির নায়েকের। শুধু ঢাকায় নয়, তাঁর সফরসূচিতে দেশের বাইরে আরও কয়েকটি স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
তবে সরকারি সূত্র বলছে, তাঁর উপস্থিতিতে বিপুল জনসমাগমের আশঙ্কা ছিল। এত বড় পরিসরে জনসমাগম হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাজারো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন ঘিরে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী ব্যস্ত থাকায় এত জনবল দেওয়া সম্ভব নয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত
মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন:
- গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান,
- প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী,
- প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবদুল হাফিজ,
- পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমসহ বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সভার আলোচনায় জানানো হয়,
“নির্বাচনের আগে দেশে বড় আকারের জনসমাবেশ বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সফর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”
ফলে, নিরাপত্তার স্বার্থে জাকির নায়েকের সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনের ব্যস্ততা
বাংলাদেশ এখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বেশিরভাগ সদস্য নির্বাচন নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি নাগরিক, বিশেষ করে জনসমাগম-নির্ভর বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“জাকির নায়েক অত্যন্ত জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা। তিনি এলে হাজারো মানুষ উপস্থিত থাকবেন, যা নির্বাচনপূর্ব সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”
জাকির নায়েক কে?
ড. জাকির নায়েক একজন বিশ্বখ্যাত ইসলামি বক্তা ও গবেষক। তিনি ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন (IRF)-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তরভিত্তিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান সারা বিশ্বে জনপ্রিয়।
তবে ভারতে তাঁর প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রম নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। ২০১৬ সালে ভারত সরকার তাঁর সংগঠনটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।
তবে বিশ্বজুড়ে তাঁর বক্তৃতা ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ও যুক্তিনির্ভর চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর লক্ষ লক্ষ অনুসারী সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়।
বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা
বাংলাদেশে জাকির নায়েকের বিপুল অনুসারী রয়েছে। ইউটিউব, ফেসবুক এবং ইসলামি অনুষ্ঠানগুলিতে তাঁর বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
তাঁর আসার খবরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে “Welcome Zakir Naik to Bangladesh” হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করছিল।
কিন্তু সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর কিছু মানুষ হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকে বলছেন,
“আমরা আশা করেছিলাম, তিনি এসে ইসলামের শান্তির বার্তা পৌঁছে দেবেন।”
সরকারের অবস্থান
সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন,
“জাকির নায়েকের আগমন নিয়ে জনগণের মধ্যে আগ্রহ ছিল, তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়টি আগে বিবেচ্য। পরিস্থিতি অনুকূল হলে ভবিষ্যতে তাঁর সফর নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।”
অন্যদিকে, ইসলামি সংগঠনগুলোর একাংশ এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছে, তবে অনেকেই সরকারের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যুক্তিকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন।
জাকির নায়েকের বাংলাদেশ সফর বাতিল হলেও, তাঁর প্রতি মানুষের আগ্রহ ও শ্রদ্ধা কমেনি। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূল হলে তিনি বাংলাদেশে আসবেন এমন প্রত্যাশা এখনও অনেকের।
তবে আপাতত দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় তাঁর এই সফর স্থগিত রেখেছে সরকার।








