আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সারাদেশে চলছে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ভোটারদের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ চলছে। তবে ভোট দেওয়ার পর সবার মনে একটাই প্রশ্ন থাকে ভোটের ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়া আসলে কেমন? কীভাবে কেন্দ্র থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছায় আপনার দেওয়া ভোটটি?
চলুন, আজকের প্রতিবেদনে জেনে নিই ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত।
ভোট গণনা কখন এবং কীভাবে শুরু হয়
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। তবে ৪টার পরেও যদি কেন্দ্রের ভেতর ভোটার উপস্থিত থাকে, তবে তাদের ভোট না নেওয়া পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষ হয় না। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে ব্যালট বাক্সগুলো তালাবদ্ধ (লক) করেন।
এরপর সেই ব্যালট বাক্সগুলো ভোটকেন্দ্রের ভেতরেই পূর্বনির্ধারিত একটি কক্ষে গণনার জন্য নেওয়া হয়।
গণনা কক্ষে কারা উপস্থিত থাকতে পারেন
ভোট গণনার সময় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়:
- প্রতিটি প্রার্থীর একজন করে পোলিং এজেন্ট।
- দায়িত্বপ্রাপ্ত পোলিং অফিসার ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
- অনুমোদিত সাংবাদিক ও দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করার প্রক্রিয়া
এবারের নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে দুটি ভোট একটি সংসদীয় আসনের জন্য এবং অন্যটি গণভোট। এ কারণে ফলাফল তৈরিতে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ভোট গণনার শুরুতে ব্যালট বাক্স খুলে মেঝেতে ঢালা হয়। এরপর সাদা রঙের সংসদ নির্বাচনের ব্যালট এবং গোলাপি রঙের গণভোটের ব্যালট আলাদা করা হয়। এই কাজগুলো করার সময় পোলিং এজেন্টরা কড়া নজর রাখেন।
কোন ব্যালটগুলো বাতিল বলে গণ্য হয়
ভোট গণনার সময় কিছু ব্যালট বাতিল হতে পারে। যেমন:
- যদি ব্যালট পেপারে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর না থাকে।
- যদি কোনো ব্যালট ছিঁড়ে যায় বা অস্পষ্ট থাকে।
- যদি সিলটি সঠিকভাবে দেওয়া না হয় বা একাধিক প্রতীকে সিল থাকে।
১৬ নম্বর ফরম ও রেজাল্ট শিট তৈরি
সব ব্যালট আলাদাভাবে গণনার পর তা নির্বাচন কমিশনের সুনির্দিষ্ট ফর্মে লিপিবদ্ধ করা হয়। সংসদ নির্বাচনের ফলাফল তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় ‘১৬ নম্বর ফরম’।
এই রেজাল্ট শিটে প্রার্থীর নাম, প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা (অংকে ও কথায়), বাতিল ভোটের সংখ্যা এবং মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা স্পষ্টভাবে লিখতে হয়। এখানে কোনো প্রকার ঘষামাজা বা কাটাকাটি করা আইনত নিষিদ্ধ। রেজাল্ট শিট তৈরির পর সেখানে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং উপস্থিত এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
পোস্টাল ব্যালট এবং এর গুরুত্ব
এবারের নির্বাচনে একটি বিশেষ দিক হলো প্রবাসী ভোটার এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া পোস্টাল ব্যালট। সাধারণ কেন্দ্রের ভোট গণনার পর রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এই পোস্টাল ব্যালটগুলো খোলা হয়। পোলিং এজেন্টদের সামনেই এই ব্যালটগুলো গণনা করে মূল ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
ফলাফল কারচুপির কি কোনো সুযোগ আছে?
অনেকেই জানতে চান, রেজাল্ট পরিবর্তন করে অন্য কাউকে বিজয়ী করা সম্ভব কি না। নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান প্রক্রিয়ায় এটি প্রায় অসম্ভব। কারণ:
১. প্রতিটি ধাপে পোলিং এজেন্টরা উপস্থিত থাকেন।
২. কেন্দ্রেই একটি রেজাল্ট কপি নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
৩. ফলাফলের কপি সাংবাদিক ও এজেন্টদের দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ ওঠে যে, যদি বিরোধী এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়, তবে কারচুপির শঙ্কা থাকে। তাই এজেন্টদের উপস্থিতিই স্বচ্ছতার প্রধান চাবিকাঠি।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা
প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ফলাফল সিলগালা করে পুলিশের নিরাপত্তায় রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে কন্ট্রোল রুম থেকে মাইকে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়। সব কেন্দ্রের ফলাফল আসার পর পোস্টাল ব্যালট যোগ করে চূড়ান্ত বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
আপনার কি ফলাফলের বিষয়ে কোনো আপত্তি আছে?
যদি কোনো প্রার্থী মনে করেন যে গণনা সঠিক হয়নি, তবে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনঃগণনার আবেদন করতে পারেন। কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ভোট আবার গণনা করা হতে পারে। এ ছাড়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নির্বাচনের পরে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সুযোগও পান।








