২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ১৮ মাস পর আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সারাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এক নজিরবিহীন গণভোট। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির ক্ষমতার পালাবদল এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স এবং ডয়চে ভেলের মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
আল জাজিরা: ‘গণতন্ত্রে ফেরার বড় পরীক্ষা’
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বাংলাদেশের এই নির্বাচন নিয়ে নিয়মিত ‘লাইভ আপডেট’ প্রকাশ করছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার আজ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই ভোটকে একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ বা বড় পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করেছে তারা। আল জাজিরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, এবারই প্রথম বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো শক্তিগুলোর মধ্যে একটি নতুন সমীকরণ দেখা যাচ্ছে।
বিবিসি: হাসিনা-খালেদাহীন কয়েক দশকের প্রথম নির্বাচন
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের লাইভ কাভারেজে একটি ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরেছে। তারা বলছে, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কাউকেই নির্বাচনী মাঠে দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে এবং খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বা রাজনৈতিক অনুপস্থিতির কারণে দেশের প্রধান রাজনৈতিক ধারা এক নতুন মোড় নিয়েছে।
রয়টার্স: জেন-জি ভোটারদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের বা ‘জেন-জি’র আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছে। তাদের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের জেন-জি ভোটারদের প্রত্যাশা: চাকরি, সুশাসন ও স্বাধীনতা’। রয়টার্সের মতে, তরুণ ভোটাররা কেবল একটি নতুন সরকার চায় না, তারা চায় কথা বলার স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। তৈরি পোশাক খাতের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কতটা জরুরি, তাও তাদের প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে।
ডয়চে ভেলে: ইসলামপন্থি শক্তির উত্থান
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো ইসলামপন্থি দলগুলো তাদের শক্তিশালী নির্বাচনী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে করছে সংবাদমাধ্যমটি। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামোকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল রয়েছে।
দ্য হিন্দু ও দ্য ডন: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অপপ্রচার
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে তারা।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ডন সতর্ক করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব নিয়ে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুক ও ইউটিউবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও এবং তথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভোটারদের চূড়ান্ত রায় কী হবে
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি সাংবিধানিক সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে ভোটাররা আজ গণভোটে রায় দিচ্ছেন। বিশ্ব সম্প্রদায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের পথ তৈরি করেছে, দেশের মানুষ তাকে কতটা সমর্থন করে।








