ন্যাটোতে যোগদানের লক্ষ্য ত্যাগ করার এই প্রস্তাবটি ইউক্রেনীয় নীতির জন্য একটি বিশাল পরিবর্তন। ইউক্রেন সবসময়ই রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য ন্যাটো সামরিক জোটে যোগদানের চেষ্টা করে আসছিল। এমনকি এই আকাঙ্ক্ষাটি তাদের সংবিধানেও লেখা ছিল। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বিকল্প পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে।
ন্যাটোর আশা ত্যাগ এবং রাশিয়ার লক্ষ্য পূরণ
ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করার প্রস্তাবটি রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সামরিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি পূরণ করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই রাশিয়া দাবি করে আসছিল যে, ইউক্রেন যেন কখনই ন্যাটোর সদস্য না হয়। মস্কোর দৃষ্টিতে, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদান রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। তাই জেলেনস্কির এই নমনীয়তা শান্তি আলোচনাকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
তবে একটি বিষয় এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ইউক্রেন ন্যাটো সদস্যপদ ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকলেও, তারা এখনো পর্যন্ত মস্কোর কাছে কোনো ভূখণ্ড সমর্পণ করতে রাজি নয়।
পশ্চিমা নিরাপত্তা গ্যারান্টিই এখন মূল দাবি
ন্যাটো সদস্যপদ ত্যাগের বিনিময়ে ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা চুক্তি চাইছে, যা ভবিষ্যতের রুশ আক্রমণ থামাতে সক্ষম হবে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন:
- ন্যাটোর আর্টিকল ৫-এর সমতুল্য নিশ্চয়তা: ইউক্রেন চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, যা ন্যাটোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান আর্টিকল ৫-এর মতো শক্তিশালী হবে। আর্টিকল ৫ অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে তা জোটের সব সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হয় এবং সব দেশ আক্রান্ত দেশকে সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য থাকে।
- বহুপাক্ষিক নিশ্চয়তা: কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই নয়, ইউক্রেন চায় ইউরোপীয় সহযোগী, কানাডা এবং জাপানের মতো অন্যান্য দেশের কাছ থেকেও একই ধরনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
- উদ্দেশ্য: জেলেনস্কির মতে, এই বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা তৈরি হলে এটি “আরেকটি রুশ আক্রমণ থামানোর একটি সুযোগ” হিসেবে কাজ করবে।
তিনি স্বীকার করেছেন, শুরু থেকেই ইউক্রেনের ইচ্ছা ছিল ন্যাটোতে যোগদান করা, কিন্তু “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু অংশীদার এই দিকটিকে সমর্থন করেনি।” এই বাস্তবতার কারণেই ইউক্রেন এখন দ্বিপক্ষীয় নিশ্চয়তার দিকে ঝুঁকছে।
বার্লিনে ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ৫ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস আলোচনা
এই গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয় জার্মানির বার্লিনে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনা করেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এই মার্কিন প্রতিনিধিরা ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানের জন্য কিয়েভের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেন।
আলোচনায় কী কী বিষয়ে অগ্রগতি হলো?
আলোচনার সম্পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ আলোচনার শেষে এক্স (আগের টুইটার) প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্টে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরেন:
- শান্তির ২০-দফা পরিকল্পনা: প্রতিনিধিরা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি বিশদ শান্তির জন্য ২০-দফা পরিকল্পনা নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন। এটি যুদ্ধ শেষ করার একটি সম্ভাব্য রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে।
- অর্থনৈতিক এজেন্ডা: সামরিক ও নিরাপত্তা ইস্যু ছাড়াও, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইউক্রেনের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অর্থনৈতিক এজেন্ডা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
- সাফল্যের ইঙ্গিত: উইটকফ উল্লেখ করেছেন, “অনেক অগ্রগতি হয়েছে” এবং প্রতিনিধিরা আজ সকালে আবার আলোচনার জন্য সম্মত হয়েছেন।
জেলেনস্কির উপদেষ্টা দিমিত্রি লিটভিন সাংবাদিকদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে এই আলোচনার সময়সীমা নিশ্চিত করে বলেন, “তারা পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আলোচনা চালিয়েছেন এবং আজ সকালে পুনরায় শুরু করার চুক্তির মাধ্যমে আজ শেষ হয়েছে।” লিটভিন আরও জানান, কর্মকর্তারা বর্তমানে আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি খসড়া নথিগুলো বিবেচনা করছেন, যা একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কি বৈঠকের ফলাফল নিয়ে সোমবার মন্তব্য করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আলোচনা আয়োজনে জার্মান চ্যান্সেলরের ভূমিকা
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করেন। একটি সূত্র জানায়, তিনি আলোচনার শুরুতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার পর দুই পক্ষকে আলোচনার জন্য বসিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে যান। তার এই ভূমিকা একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে সহায়ক হতে পারে। এই আলোচনার কারণে অন্যান্য ইউরোপীয় নেতারাও আজ সোমবার জার্মানির উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন বলে জানা গেছে।
ফ্রন্টলাইন ধরে যুদ্ধবিরতি: জেলেনস্কির ন্যায্য বিকল্প
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট এই আলোচনার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতির বিকল্প নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান ফ্রন্টলাইন ধরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা একটি ন্যায্য বিকল্প হতে পারে।
এর মানে হলো, ইউক্রেন বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোকে ধরে রেখে যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী। যদিও এই প্রস্তাবটি রাশিয়ার দখল করা ভূখণ্ড ইউক্রেনকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যায় (যেখানে ইউক্রেন এখনো মস্কোর কাছে ভূখণ্ড সমর্পণ করতে রাজি নয়), তবুও এটি একটি স্থিতিশীলতা আনতে পারে এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর এমন একটি প্রস্তাবকে অনেকেই একটি নমনীয় এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এটি রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে আরও বেশি মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করতে পারে, কারণ ন্যাটো নিয়ে তাদের মূল দাবিটি পূরণ হতে চলেছে।
শান্তির পথে ইউক্রেনীয় কূটনীতি
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ন্যাটো সামরিক জোটে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করার প্রস্তাবটি এই সংঘাতের সমাপ্তির জন্য একটি নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক জানালা খুলে দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যাটোর আর্টিকল ৫-এর সমতুল্য নিরাপত্তা গ্যারান্টির বিনিময়ে ইউক্রেন এই বড় ছাড় দিতে প্রস্তুত। বার্লিনে ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টার গভীর আলোচনা এবং স্টিভ উইটকফের ‘অনেক অগ্রগতি’র ঘোষণা আশা জাগিয়েছে।
সমস্ত ইউরোপীয় নেতাদের নজর এখন সোমবারের আলোচনার দিকে। ইউক্রেন, মার্কিন প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় নেতারা যদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির খসড়া তৈরি করতে সফল হন, তবে তা ইউরোপে শান্তি ফিরিয়ে আনার একটি বিশাল পদক্ষেপ হবে। তবে, ইউক্রেন যে তার কোনো ভূখণ্ড রাশিয়ার কাছে সমর্পণ করবে না, এই বিষয়ে তাদের দৃঢ় অবস্থান সংঘাতের সম্পূর্ণ অবসানের পথে এখনো একটি জটিল চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সূত্র : রয়টার্স








