ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের রেশ কাটতে না কাটতেই লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিশানায় কলম্বিয়া এবং কিউবা। ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে সরাসরি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি কিউবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
রোববার (৪ ডিসেম্বর) গভীর রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন। চলুন জেনে নেই বিস্তারিত ঘটনা এবং ট্রাম্পের এই হুমকির পেছনের কারণগুলো।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের বিস্ফোরক মন্তব্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই তার সোজা এবং কঠোর মন্তব্যের জন্য পরিচিত। তবে এবারের মন্তব্যটি লাতিন আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি কলম্বিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়া বর্তমানে একজন “অসুস্থ মানুষের” নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে তিনি সরাসরি কলম্বিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে ইঙ্গিত করেছেন। ট্রাম্পের মতে, পেত্রোর শাসনকাল কলম্বিয়াকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা রীতিমতো যুদ্ধের দামামা বাজানোর মতো।
কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে কোকেন বাণিজ্যের অভিযোগ
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের মূল কারণ হিসেবে তিনি মাদক পাচার বা কোকেন উৎপাদনকে সামনে এনেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কোকেন সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশটির সরকার এবং প্রেসিডেন্ট পেত্রো জড়িত বলে তিনি দাবি করেন।
ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলা যেমন অসুস্থ হয়ে পড়েছে, কলম্বিয়াও ঠিক তেমনই অসুস্থ। দেশটি এমন একজন ব্যক্তির (পেত্রো) নেতৃত্বে চলছে, যে কোকেন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে চায়। এটি আমরা মেনে নিতে পারি না। তবে সে বেশি দিন এটা চালিয়ে যেতে পারবে না।”
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আসছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য সেই যুদ্ধেরই একটি নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, কলম্বিয়ার বর্তমান সরকার মাদক উৎপাদন বন্ধ করার বদলে সেটিকে আরও উৎসাহিত করছে, যা আমেরিকার যুবসমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক।
সামরিক অভিযানের সরাসরি ইঙ্গিত
সবচেয়ে ভয়ের এবং আলোচনার বিষয় হলো ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা নাকচ করে দেননি। বরং তিনি বলেছেন, কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো তার কাছে “খারাপ কিছু মনে হচ্ছে না।”
সাধারণত দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমস্যা হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ট্রাম্পের কথায় স্পষ্ট যে, তিনি আলোচনার চেয়ে অ্যাকশনে বিশ্বাসী। ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর মনোভাব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সামরিক অবরোধ বা নির্দিষ্ট টার্গেটে হামলার কথাও বিবেচনা করতে পারে।
কিউবার পতন নিয়ে ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী
কলম্বিয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প কিউবা নিয়েও কথা বলেছেন। তবে কিউবার ক্ষেত্রে তার মনোভাব কিছুটা ভিন্ন। তিনি মনে করেন, কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নাও হতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি কিউবার ভঙ্গুর অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্পের মতে, কিউবা বর্তমানে পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, “কিউবা এখন পতনের জন্য প্রস্তুত। তাদের আর কোনো আয়ের উৎস নেই। দেশটি কার্যত ভেঙে পড়ছে।”
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর কিউবার নির্ভরতা
কিউবার অর্থনীতির একটি বড় অংশ ভেনেজুয়েলার সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা সস্তা তেল কিউবার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখত। কিন্তু ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং মাদুরোর গ্রেপ্তারের ফলে সেই তেলের সরবরাহ এখন অনিশ্চিত।
ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, ভেনেজুয়েলার তেল থেকে কিউবা আর কোনো সুবিধা পাচ্ছে না বা পাবে না। এই সংকটের কারণে কিউবার সরকার নিজের ভারেই ভেঙে পড়বে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া কিউবাকে শায়েস্তা করতে আমেরিকার কোনো বুলেটের প্রয়োজন হবে না, তাদের দুর্বলতাই তাদের পতনের কারণ হবে।
কিউবান-আমেরিকানদের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রচুর সংখ্যক কিউবান-আমেরিকান বসবাস করেন, যারা কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের বিরোধী। ট্রাম্প তার বক্তব্যে এই জনগোষ্ঠীর আবেগকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি দাবি করেন, কিউবার বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি এবং সম্ভাব্য পতনে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিউবানরা সন্তুষ্ট হবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্পের একটি রাজনৈতিক চাল হতে পারে। নিজের ভোটব্যাংক শক্ত করা এবং লাতিন আমেরিকান অভিবাসীদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য তিনি এমন কঠোর বার্তা দিচ্ছেন।
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে বামপন্থী সরকারগুলোর প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন কোনো নমনীয়তা দেখাবে না।
- ভেনেজুয়েলা: মাদুরোকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ইতিমধ্যে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে।
- কলম্বিয়া: গুস্তাভো পেত্রোর সরকারকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
- কিউবা: অর্থনৈতিক অবরোধ এবং চাপে ফেলে সরকার পতনের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা। যারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে যাবে, তাদেরকেই হয়তো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই হুমকির জবাবে কী প্রতিক্রিয়া জানান, সেটাই এখন দেখার বিষয়। অন্যদিকে, কিউবার অর্থনীতি আসলেই ধসে পড়ে কি না, নাকি তারা অন্য কোনো মিত্র দেশের সাহায্য নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করবে তা সময়ই বলে দেবে।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ভেনেজুয়েলার পর লাতিন আমেরিকার রাজনীতি এখন আর আগের মতো শান্ত থাকবে না। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী মনোভাব আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল পোস্ট








