রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের মেষ্টা গ্রামে থাকেন বাদশা মিয়া। স্থানীয় মানুষ ভালোবেসে তাঁকে ‘গাছের বন্ধু বাদশা’ নামে ডাকে।
তিনি দিনমজুরি শ্রমিক, কিন্তু তার নেশা গাছ লাগানো। গত প্রায় ২০ বছর ধরে রাস্তার পাশে, হাটবাজারে, গ্রামের মোড় ও মসজিদ-বিদ্যালয়ের মাঠে গাছরোপণ করছেন।
তার স্লোগান: “একমুঠো ভাত নয়, একমুঠো অক্সিজেন চাই”।
গাছ রোপণের শুরু
২০০৪ সালের নভেম্বর এক বিকেলে বাদশা তাঁর দুই সন্তান মিলন মিয়া ও লাভলী আক্তারকে নিয়ে বসেছিলেন বাড়ির পাশের রাস্তার ধারে। তখন তারা ফল খেতে চায়, টাকার অভাবে তিনি তাদের ফল কিনে দিতে পারেননি, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন গাছ লাগানোর ।
পরের বছরের জুলাইতে তিনি শানেরহাট-বড়দরগা সড়কের পাশে প্রথম ৫০টি আম ও কাঁঠাল গাছ রোপণ করেন।
বাধা ও সংগ্রাম
শুরুতে অনেকেই বাদশাকে ‘পাগল’ বলেছিল। ২০০৫ সালে রাস্তার পাশে রোপণ করা গাছগুলো উপড়েও ফেলা হয়, বড় বাধার মুখে পড়েন তিনি।
কিন্তু তিনি থামেননি। নিজের আয় থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন, চার ভাগের এক ভাগ টাকা গাছরোপণের জন্য ব্যবহার করবেন।
আজকের অবস্থা ও ফল
এখন পর্যন্ত তিনি ৩০ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন ফলের ও বনজ গাছ রোপণ করেছেন, এদের মধ্যে আম, জাম, কাঁঠাল, আমড়া, লিচু, পেয়ারা, নারকেল, খেজুর, বেল-আতা-চালতা রয়েছে।
রাস্তায় সারি সারি ফলের গাছ, বাড়ির পথে গাছের সারি, ফল দিচ্ছে, ছায়া দিচ্ছে পথচারীদের।
তিনি শুধু নিজের গ্রামে নয়, পাশের অন্তত ১৫টি গ্রামে তাঁর রোপিত গাছ রয়েছে।
সামাজিক প্রভাব
স্থানীয়রা এখন সুফল পাচ্ছেন। গাছের ছায়ায় বিশ্রাম, ফল খাওয়ার সুযোগ। বাড়ি-হাট-সড়কে পরিবেশ বদলায়। ইউনিয়ন পরিষদের একজন বলেন, বাদশার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
এছাড়া, শুক্রবারগুলোতে বাদশা বাইসাইকেলে চারা নিয়ে রওনা দিতেন, জুমার নামাজের পর মসজিদে গিয়ে গাছরোপণ ও গাছের উপকারিতা সম্পর্কে লোকজনকে বলতেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও উৎসাহ
বাদশা মিয়া একজন কৃষকের সন্তান। লেখাপড়া করতে পারেননি আর্থিক সংকটে। মাত্র সাত বছর বয়সে মাঠে ছাগল-গরু চরাতে শুরু করেছিলেন। এখন তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। কৃষিজমি না থাকলেও তিনি সামান্য জমিতেই বাড়ি করেছেন।
তিনি বলেন, “আমি বেঁচে না থাকলেও আমার গাছ বেঁচে থাকবে, মানুষকে ছায়া, ফল দেবে, তাতেই আমার সুখ।”
গাছের বন্ধু বাদশা মিয়া শুধু গাছ লাগাননি, তিনি একটি ভাবনা রোপণ করেছেন: “এক মুঠো অক্সিজেন চাই”।
আজ তার লাগানো গাছ আমাদের ছায়া দিচ্ছে, ফল দিচ্ছে, পরিবেশ বদলাচ্ছে। তার সেই ছোট শুরু, তার ধৈর্য, কাজের ভালোবাসা, সবই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।
আমরা যদি তার মতো একটি হৃদয়বান ভাবনায় এগিয়ে আসি, তাহলে শুধু আজকের দিনের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও একটুখানি ভালো পরিবেশ রেখে যেতে পারি।








