ক্রিকেট যে গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা, তা আরও একবার প্রমাণ হলো সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। বিপিএলের দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল যেন এক রোলার কোস্টার রাইড। কখনও ম্যাচ হেলে পড়ছিল নোয়াখালী এক্সপ্রেসের দিকে, আবার কখনও সিলেট টাইটান্সের দিকে। হ্যাটট্রিক, রান আউট, নো-বল, ছক্কা এবং রিভিউ নাটক, কী ছিল না এই ম্যাচে? অবশেষে স্নায়ুচাপের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে শেষ বলের রোমাঞ্চে ১ উইকেটে জয় তুলে নিল মেহেদী হাসান মিরাজের সিলেট টাইটান্স।
শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করে ১৪৩ রান সংগ্রহ করে নোয়াখালী। জবাবে ব্যাট করতে নেমে হারের দুয়ার থেকে ফিরে এসে শেষ বলে জয়ের বন্দরে পৌঁছায় সিলেট। এই জয়ের ফলে আসরে শুভ সূচনা করল স্বাগতিকরা, অন্যদিকে টানা দ্বিতীয় হারে হতাশায় ডুবল নোয়াখালী এক্সপ্রেস।
শেষ ওভারের শ্বাসরুদ্ধকর নাটক
ম্যাচ জয়ের জন্য শেষ ওভারে সিলেট টাইটান্সের প্রয়োজন ছিল ১৩ রান। হাতে উইকেট ছিল মাত্র ২টি। নোয়াখালীর হয়ে বল হাতে আসেন সাব্বির হোসেন। ক্রিজে ছিলেন ইথান ব্রুকস ও মোহাম্মদ আমির।
ওভারের শুরুটা ছিল নোয়াখালীর পক্ষেই। প্রথম দুই বল ডট দিয়ে সিলেটকে চাপে ফেলে দেন সাব্বির। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি। তৃতীয় বলটি করতে গিয়ে বড় ভুল করে বসেন সাব্বির, দিয়ে বসেন ‘নো বল’। এই একটি ভুলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফ্রি হিটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশাল ছক্কা হাঁকান ইথান ব্রুকস। সমীকরণ নেমে আসে ৪ বলে সহজ লক্ষে। পরের বলে চার মেরে ব্রুকস সিলেটকে জয়ের আরও কাছে নিয়ে যান।
কিন্তু নাটক সেখানেই শেষ হয়নি। পরের বলে অহেতুক রান নিতে গিয়ে রান আউটের শিকার হন সেট ব্যাটার ব্রুকস। আবারও জমে ওঠে ম্যাচ। সাব্বির পরের বলটি ওয়াইড করলে সমীকরণ দাঁড়ায় ১ বলে ১ রান। শেষ বলে স্ট্রাইকে ছিলেন সালমান ইরশাদ। তিনি ব্যাট লাগাতে না পারলেও লেগ বাই সূত্রে ১ রান নিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন। নোয়াখালী শেষ মুহূর্তে এলবিডব্লিউর রিভিউ নিলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি, বল স্টাম্পের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ফলে ১ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় পায় সিলেট।
মেহেদী হাসান রানার হ্যাটট্রিক ও হতাশা
ম্যাচে নোয়াখালী এক্সপ্রেস হেরে গেলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল ছিলেন পেসার মেহেদী হাসান রানা। তিনি একাই ম্যাচটি নোয়াখালীর দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। সিলেটের ইনিংসের ১৮তম ওভারে বল করতে এসে তিনি সৃষ্টি করেন অনন্য এক নজির।
সিলেটের তখন জয়ের জন্য ২৭ বলে দরকার ছিল মাত্র ২৭ রান। হাতে ছিল ৭ উইকেট। এমন সহজ সমীকরণের সময় রানা তার জাদুকরী বোলিং শুরু করেন। প্রথমে সেট ব্যাটার আফিফ হোসেনকে ফেরান রেজাউর রহমান রাজা। এরপর নিজের ওভারে পরপর তিন বলে সিলেট অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ, নাসুম আহমেদ এবং সৈয়দ খালেদ আহমেদকে আউট করে চলতি বিপিএলের প্রথম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন রানা।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের অষ্টম বোলার হিসেবে টানা তিন বলে তিন উইকেট নেওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। আর বিপিএলের ইতিহাসে তিনি নবম হ্যাটট্রিকম্যান। ৪ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েও দলকে জেতাতে না পারার হতাশায় মাঠ ছাড়েন এই বাঁহাতি পেসার।
পারভেজ হোসেন ইমনের প্রতিরোধ
১৪৪ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে সিলেট টাইটান্স। দলীয় ৩৪ রানের মধ্যে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটার সাইম আইয়ুব (০), রনি তালুকদার (৯) এবং জাকির হাসান (১৩) সাজঘরে ফেরেন।
দল যখন ধুঁকছিল, তখন ত্রাতা হয়ে আসেন পারভেজ হোসেন ইমন। সাধারণত ওপেনিংয়ে নামলেও এদিন তিনি চারে ব্যাট করতে নামেন। অধিনায়ক মিরাজকে সাথে নিয়ে তিনি গড়েন ৬৬ বলে ৮৩ রানের এক দুর্দান্ত জুটি। মিরাজ ৩৩ বলে ৩৩ রান করে আউট হলেও এক প্রান্ত আগলে রেখেছিলেন ইমন।
তিনি ৪১ বলে ২টি ছক্কা ও ৬টি চারের মারে ৬০ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেন। জাহির খানের বলে বোল্ড হওয়ার আগে তিনিই মূলত সিলেটের জয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়ে যান। আগের ম্যাচেও তিনি ৬৫ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেছিলেন।
খালেদ আহমেদের আগুন ঝরা বোলিং
এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নামা নোয়াখালী এক্সপ্রেসের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। সিলেটের পেসার সৈয়দ খালেদ আহমেদ ইনিংসের শুরুতেই প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে ফেলেন।
খালেদের তোপে মাত্র ৯ রানে ৩ উইকেট হারায় নোয়াখালী। ওপেনার মাজ সাদাকাত ও হাবিবুর রহমান সোহান উভয়েই ফিরেন শূন্য রানে। হায়দার আলিও খাতা খোলার আগেই এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন। খালেদ তার ৪ ওভারের স্পেলে ১টি মেডেনসহ মাত্র ২৩ রান দিয়ে তুলে নেন গুরুত্বপূর্ণ ৪টি উইকেট। দুর্দান্ত বোলিংয়ের সুবাদে তিনি ম্যাচ সেরার পুরস্কারও লাভ করেন।
মাহিদুল ও জাকেরের লড়াই
শুরুর বিপর্যয় সামাল দিয়ে নোয়াখালীকে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দেন মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন ও জাকের আলি। অধিনায়ক সৈকত আলি ২৪ রান করে ফেরার পর, ষষ্ঠ উইকেটে এই দুজন গড়েন ৩৯ বলে ৬৬ রানের জুটি।
জাকের আলি ১৭ বলে ২৯ রান করে আউট হলেও, শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন মাহিদুল। তিনি ৫১ বলে ৩টি ছক্কা ও ১টি চারের সাহায্যে ৬১ রান করেন। তার এই ইনিংসের কল্যাণেই নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১৪৩ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় নোয়াখালী।
পরিসংখ্যান ও পয়েন্ট টেবিল
এই জয়ের ফলে পয়েন্ট টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করল সিলেট টাইটান্স। অন্যদিকে, তারুণ্যনির্ভর দল নোয়াখালী এক্সপ্রেস ভালো খেলেও অভিজ্ঞতার অভাবে টানা দুই ম্যাচে হারের স্বাদ পেল। সিলেটের বোলাররা যেমন দাপট দেখিয়েছেন, তেমনি নোয়াখালীর বোলাররাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন। পঞ্চম বোলারের অভাব এবং শেষ ওভারে অতিরিক্ত রান দেওয়াই মূলত নোয়াখালীর হারের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
- নোয়াখালী এক্সপ্রেস: ২০ ওভারে ১৪৩/৭ (মাহিদুল ৬১*, জাকের ২৯, সৈকত ২৪; খালেদ ৪/২৩, সাইম ২/২৫, আমির ১/২৫)।
- সিলেট টাইটান্স: ২০ ওভারে ১৪৪/৯ (পারভেজ ৬০, মিরাজ ৩৩, ব্রুকস ১৬; রানা ৪/৩৪, হাসান ২/১৯)।
- ফল: সিলেট টাইটান্স ১ উইকেটে জয়ী।
- ম্যাচ সেরা: সৈয়দ খালেদ আহমেদ (সিলেট টাইটান্স)।








