পৃথিবীতে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার বশবর্তী হয়ে মানুষের ক্ষতি করার অন্যতম একটি নিকৃষ্ট মাধ্যম হলো জাদুটোনা বা কালো জাদু। অনেক সময় মানুষ নিজের সাময়িক পার্থিব স্বার্থ হাসিল করতে বা অন্যকে হিংসা করে আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তির কথা ভুলে গিয়ে এমন অপকর্মের দ্বারস্থ হয়। সাধারণত জিনের কুপ্রভাব কিংবা বিশেষ কিছু কুফরি মাধ্যমে মানুষের ওপর এই জাদু প্রয়োগ করা হয়, যা অনেক সময় সাধারণ চিকিৎসায় বা ওষুধে নিরাময় হতে চায় না।
ইসলামে জাদুটোনা করাকে কবিরা গুনাহ ও কুফরি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সম্প্রতি আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ জাদুটোনার ভয়াবহতা ও এর থেকে বেঁচে থাকার উপায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, কেউ জাদুটোনা বা কালো জাদুর শিকার হলে তার শরীরে ও আচরণে বেশ কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়।
জাদুটোনা বা কালো জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির প্রধান লক্ষণসমূহ
কেউ জাদুটোনায় আক্রান্ত হলে তার মধ্যে বেশ কিছু মানসিক ও শারীরিক উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপনার বা পরিচিত কারও মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন:
- কুরআনের তেলাওয়াতে তীব্র অস্বস্তি: জাদুগ্রস্ত ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের তেলাওয়াত বা জিকির সহ্য করতে পারে না। কুরআন শুনলে তার মধ্যে বিরক্তি, রাগ বা অস্থিরতা কাজ করে।
- কারণ ছাড়াই তীব্র মাথাব্যথা: চিকিৎসা করানোর পরও যদি অনবরত তীব্র মাথাব্যথা লেগেই থাকে এবং কোনো ওষুধেই তা না কমে, তবে তা জাদুর প্রভাব হতে পারে।
- অহেতুক কান্না ও অনবরত চোখের পানি: কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা দুঃখের ঘটনা ছাড়াই হঠাৎ অনবরত কান্না পাওয়া বা চোখ দিয়ে অবিরাম পানি পড়া।
- একাকী থাকার প্রবণতা: আক্রান্ত ব্যক্তি সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সবসময় আঁধার ঘরে একা একা থাকতে পছন্দ করে।
- প্রচণ্ড ক্ষুধামন্দা ও শারীরিক দুর্বলতা: খাবারের প্রতি চরম অনিহা বা অরুচি তৈরি হওয়া এবং শরীর সবসময় অলস ও দুর্বল হয়ে পড়ে থাকা।
- অনবরত হাই তোলা ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা: সারাক্ষণ একটানা হাই তোলা, ঝিমুনি আসা এবং শরীরে সার্বিক অস্থিরতা অনুভব করা।
জাদুটোনা বা কালো জাদু থেকে বাঁচার সুন্নাহসম্মত প্রতিকার
জাদুটোনা থেকে আত্মরক্ষা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থতার জন্য কবিরাজ বা ভণ্ড সাধকদের কাছে না গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
১. নিয়মিত সকাল-সংধ্যয়ার মাসনুন জিকির ও দোয়া
প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশিত আত্মরক্ষামূলক দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করতে হবে। এটি যেকোনো ধরনের কুপ্রভাব, জাদুটোনা ও কুনজর থেকে মানুষকে নিরাপদে রাখে।
২. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস-এর আমল
প্রতিদিন নিয়মিত সকাল ও সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক এবং সুরা নাস ৩ বার করে পাঠ করে পানিতে ফু দিয়ে পান করা যেতে পারে। এছাড়া আসরের পর বা মাগরিবের সময় এই সুরাগুলো পড়ে জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির শরীরে ফু দিলে আল্লাহর রহমতে জাদুর প্রভাব কাটতে শুরু করে।
৩. ঘরে সুরা বাকারা তেলাওয়াত করা
যে ঘরে নিয়মিত পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারা তেলাওয়াত করা হয়, সেই ঘরে শয়তান ও জিনের কুপ্রভাব প্রবেশ করতে পারে না এবং সেখানে কেউ জাদুটোনা করে সুবিধা করতে পারে না। তাই ঘরে নিজে বা অডিও ক্যাসেটে সুরা বাকারা চালু রাখা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
জাদুটোনা বা কালো জাদু একটি বাস্তব সত্য হলেও এ নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত বা বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। শারীরিক যেকোনো সমস্যায় প্রথমে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যদি চিকিৎসায় কোনো রোগ ধরা না পড়ে এবং উপরে উল্লেখিত লক্ষণগুলো স্পষ্ট থাকে, তবে কোনো হক্কানি আলেমের মাধ্যমে শরিয়তসম্মত ‘রুকিয়া’ বা ঝাড়ফুঁকের সাহায্য নিন। ঈমান মজবুত রেখে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহর রহমতে যেকোনো জাদুটোনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।








