বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হচ্ছে সিলেট। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হলেও এই অঞ্চলটি ভূ-প্রাকৃতিকভাবে খুবই সংবেদনশীল একটি এলাকায় অবস্থিত। আর এই সংবেদনশীলতার প্রমাণ মিলল বুধবার (১০ ডিসেম্বর) মধ্যরাতে। মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুইবার মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলো সিলেটে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (EMSC) এবং ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (NCS) এই জোড়া ভূকম্পনের খবর নিশ্চিত করেছে। গভীর রাতে যখন অধিকাংশ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই এই ঘটনা ঘটে। এই আকস্মিক ঝাঁকুনি ঘুমন্ত মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কিন্তু কেন অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুইবার এমন ঘটনা ঘটল? এর উৎপত্তিস্থলই বা কোথায় এবং এর পেছনে কী ধরনের ভূ-তাত্ত্বিক কারণ থাকতে পারে—এসব নিয়েই আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।
১০ ডিসেম্বর মধ্যরাতের সেই দুই ভূমিকম্পের বিস্তারিত তথ্য
ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের মানুষ মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুটি স্পষ্ট ভূকম্পন অনুভব করেন। এই ধরনের কাছাকাছি সময়ে পরপর একাধিক কম্পন সাধারণত প্রধান ভূমিকম্পের (Mainshock) পরে হওয়া ছোট কম্পন (Aftershock) বা একেবারেই ভিন্ন দুটি ঘটনা হতে পারে। সিলেটের ঘটনায় কম্পন দুটির মাত্রা কাছাকাছি হওয়ায়, এটি স্থানীয় ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থার দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
প্রথম ভূমিকম্প: রাত ২টা ৫০ মিনিট ৩১ সেকেন্ড
বুধবার দিনগত রাত ২টা ৫০ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে সিলেটে প্রথম ভূকম্পনটি অনুভূত হয়। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি জানিয়েছে, প্রথমটির মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৫। এই মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের হয়ে থাকে, যা সাধারণত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করে না, তবে মানুষের মনে যথেষ্ট আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
প্রথম ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। এই উৎপত্তিস্থল নির্ণয় করা জরুরি, কারণ এর মাধ্যমেই বোঝা যায় ভূ-পৃষ্ঠের ঠিক কোন অংশ থেকে শক্তি নির্গত হয়েছে। এনসিএস-এর তথ্য অনুসারে, প্রথম ভূকম্পনের কেন্দ্রের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ছিল ২৪.৮৩০; ৯২.১৮০ দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশে। এর গভীরতা ছিল ২০ কিলোমিটার। ভূ-পৃষ্ঠের এত কম গভীরতায় কম্পনের উৎস থাকলে সাধারণত আশপাশের এলাকায় ঝাঁকুনি বেশি অনুভূত হয়।
দ্বিতীয় ভূমিকম্প: রাত ২টা ৫৫ মিনিট ১৪ সেকেন্ড
প্রথম কম্পনের ঠিক পরপরই অর্থাৎ রাত ২টা ৫৫ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে সিলেট আবার কেঁপে ওঠে। সময় হিসেবে এটি মাত্র চার মিনিট চুয়াল্লিশ সেকেন্ডের ব্যবধান। দ্বিতীয় ভূকম্পনের মাত্রা ছিল প্রথমটির চেয়ে সামান্য কম, যা ৩ দশমিক ৩।
দ্বিতীয় কম্পনটির উৎপত্তিস্থলও ছিল জকিগঞ্জ সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাতেই। এর অবস্থান ছিল ২৪.৭৯০; ৯২.২১০ অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে এবং গভীরতা ছিল ৩০ কিলোমিটার। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দ্বিতীয় কম্পনটির গভীরতা (৩০ কিমি) প্রথমটির (২০ কিমি) চেয়ে ১০ কিলোমিটার বেশি ছিল।
কম্পন দুটির মাত্রা ৩-এর বেশি হওয়ায়, এগুলো স্পষ্টতই অনুভূত হয়েছে এবং মানুষের ঘুম ভেঙে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ঘন ঘন এমন কম্পন এই অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক সক্রিয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল জকিগঞ্জ এবং এর ভূ-তাত্ত্বিক গুরুত্ব
উভয় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। এই অঞ্চলটি ভৌগোলিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিলেট অঞ্চলটি মূলত ইন্দো-বার্মা প্লেট (India-Burma Plate) এবং ইউরেশীয় প্লেট (Eurasian Plate) নামক দুটি বড় ভূ-ত্বকীয় পাতের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। এই প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে বা একটি অন্যটির নিচে প্রবেশ করছে।
এই প্লেটগুলোর চলাচল বা সংঘর্ষের কারণেই এই অঞ্চলে প্রায়শই ছোট-বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশেষ করে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার—এই জেলাগুলো নিয়ে গঠিত এলাকাকে বাংলাদেশ-এর সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অঞ্চলের ভূ-অভ্যন্তরে অনেকগুলো সক্রিয় চ্যুতি (Fault line) বা ফাটল রেখা রয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
জকিগঞ্জ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নির্দেশ করে যে স্থানীয় চ্যুতি রেখাগুলিতে শক্তি সঞ্চয় হয়ে তা হঠাৎ নির্গত হয়েছে। পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুইবার কম্পনের ঘটনাটি একটি ‘ডাবলট’ ইভেন্ট হতে পারে, যেখানে প্রায় একই আকারের দুটি ভূমিকম্প প্রায় একই সময়ে এবং একই স্থান থেকে হয়। অথবা এটি প্রধান কম্পন (Mainshock) ও আফটারশক (Aftershock) এর একটি জোড়া, যেখানে দ্বিতীয় কম্পনটি প্রথম কম্পনের দ্বারা চাপানো বাড়তি শক্তির মুক্তি ঘটায়। ভূতত্ত্ববিদেরা এই দুটি কম্পনের কারণ নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করছেন।
সিলেটের ভূমিকম্পের সঙ্গে মিয়ানমারের কম্পনের কোনো যোগসূত্র আছে কি?
১০ ডিসেম্বরের রাতেই আরও একটি ভূমিকম্পের খবর পাওয়া যায়। প্রায় রাত ২টা ৫৪ মিনিট ৩ সেকেন্ডে মিয়ানমারে ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের উত্তর মান্দালয় থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে।
সিলেটে হওয়া দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি (রাত ২টা ৫৫ মিনিট ১৪ সেকেন্ড) মিয়ানমারের কম্পনের এক মিনিটেরও কম সময় পরে অনুভূত হয়। যদিও তিনটি কম্পনের সময় খুবই কাছাকাছি, তবে এর মধ্যে সিলেটের দুইটি এবং মিয়ানমারের একটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূ-পৃষ্ঠের অনেক গভীর থেকে আসা শক্তিশালী তরঙ্গ খুব দ্রুত বিস্তৃত হয়। তবে এই তিনটি কম্পন একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। সাধারণত, দুটি ভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্লেটের মধ্যে দূরত্ব বেশি হলে তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক কোনো যোগসূত্র থাকে না। তবে প্লেটের সামগ্রিক কাঠামোগত দুর্বলতা একটি অঞ্চলের কম্পন অন্য এলাকায় চাপ বা টানের মাধ্যমে প্রভাব ফেলতে পারে।
সিলেট এবং মিয়ানমার উভয়ই ইন্দো-বার্মা প্লেট এবং ইউরেশীয় প্লেটের সংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত। এই প্লেটগুলোর সংঘর্ষজনিত কারণে সৃষ্ট টেকটোনিক চাপ এই দুটি এলাকায় ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে। তবে এই ক্ষেত্রে, কাছাকাছি সময়ে পরপর তিনটি কম্পন হওয়া সত্ত্বেও, উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব এবং ভিন্ন ভিন্ন চ্যুতি রেখার সক্রিয়তা নির্দেশ করে যে এগুলো স্বতন্ত্র ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ভূমিকম্প হলে সাধারণ মানুষের করণীয় কী?
এই ধরনের জোড়া কম্পনের ঘটনা সিলেটবাসীকে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি এবং সতর্কতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও এই কম্পনগুলো বড় ছিল না, কিন্তু ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ হিসেবে আমাদের সর্বদা প্রস্তুত থাকা উচিত।
ভূমিকম্প শুরু হলে দ্রুত ‘ড্রপ, কভার, অ্যান্ড হোল্ড অন’ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। অর্থাৎ, মেঝেতে বসে পড়া, শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং কম্পন না থামা পর্যন্ত সেটি শক্ত করে ধরে রাখা।
যদি কোনো মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া সম্ভব না হয়, তবে শক্ত কোনো দেয়ালের পাশে বা ভেতরের কোণে মাথা ও ঘাড় দুই হাত দিয়ে ঢেকে বসে থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই আতঙ্কিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করা বা লিফট ব্যবহার করা উচিত নয়। বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের জন্য বিল্ডিং কোড মেনে ভবন তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এই অঞ্চলে বসবাসকারী সকলের উচিত ভূমিকম্পের সময় করণীয় এবং বাড়ির কোথায় কোথায় আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে, সেই বিষয়ে পরিবারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। মধ্যরাতের এই জোড়া কম্পন সিলেটে একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে, যা আমাদের সকলের মনে রাখা প্রয়োজন।








