অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত বন্ডাই বিচে গত রবিবার ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হামলার ঘটনায় এক নতুন মোড় এসেছে। দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও আততায়ী সাজিদ আকরাম আসলে ভারতের নাগরিক ছিলেন। তিনি ভারতের হায়দরাবাদ শহর থেকে দীর্ঘ সময় আগে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়া জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং সিডনির সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাজিদ আকরামের পরিচয় ও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর ইতিহাস
তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে যে, সাজিদ আকরাম ১৯৯৮ সালে ভারতের হায়দরাবাদ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যান। তিনি মূলত একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে প্রথম দেশটিতে প্রবেশ করেছিলেন। হায়দরাবাদের একটি নামী প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ব্যবসা শিক্ষা বা কমার্স বিভাগে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। উচ্চশিক্ষা এবং সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তিনি অস্ট্রেলিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন। গত কয়েক দশকে তিনি সেখানে নিজের অবস্থান শক্ত করেন এবং বর্তমানে তার সন্তানেরাও অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণ নাগরিক। সাজিদ আকরামের পাসপোর্ট এবং নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সব নথিপত্র এখন প্রশাসনের হাতে রয়েছে, যা নিশ্চিত করছে যে তার আদি নিবাস ছিল ভারতে।
সর্বশেষ ভারত সফর ও জীবনযাত্রা
তদন্তকারীদের একটি দল সাজিদ আকরামের ভ্রমণ ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখেছে যে, ২০২২ সালে তিনি সর্বশেষ ভারতে গিয়েছিলেন। তার আদি বাড়ি হায়দরাবাদে গিয়ে তিনি বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। এরপর তিনি আবার অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসেন। বাহ্যিকভাবে তিনি একজন সাধারণ অভিবাসী হিসেবে জীবনযাপন করলেও তার মনে এমন হিংস্রতা কীভাবে দানা বেঁধেছিল, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তার প্রতিবেশীরা তাকে শান্ত প্রকৃতির মানুষ হিসেবে চিনলেও এই ভয়াবহ ঘটনা সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার অতীত রেকর্ড ও অন্যান্য কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, তাও গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বন্ডাই বিচে গত রোববারের সেই রক্তক্ষয়ী হামলা
সিডনির অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং জনবহুল বন্ডাই সৈকতে গত রোববার বিকেলে যখন মানুষ ছুটির মেজাজে ছিল এবং ইহুদিদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছিল, ঠিক তখনই এই ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু হয়। সাজিদ আকরাম এবং তার ছেলে নাভিদ আকরাম হঠাৎ করে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন পরিবেশ একটি বিভীষিকায় পরিণত হয়। বন্দুকের গুলিতে একের পর এক মানুষ লুটিয়ে পড়তে থাকে। এই নিষ্ঠুর হামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনের প্রাণ হারানোর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এই হত্যাকাণ্ড শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, সারা বিশ্বের মানবিক চেতনাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
ঘটনাস্থলে সাজিদের মৃত্যু ও আহত ছেলের বর্তমান অবস্থা
হামলা শুরু হওয়ার পরপরই অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সন্ত্রাসীদের দমন করতে তারা পাল্টা গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে প্রধান হামলাকারী সাজিদ আকরাম ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অন্যদিকে তার সহযোগী এবং ছেলে নাভিদ আকরাম গুরুতর আহত হন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছে। বর্তমানে নাভিদ চিকিৎসাধীন থাকলেও তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। সুস্থ হওয়ার পর নাভিদকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই হামলার মূল উদ্দেশ্য এবং পেছনে অন্য কারো ইন্ধন ছিল কি না, তা বের করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রশাসনের বক্তব্য ও কঠোর অবস্থান
অস্ট্রেলিয়া সরকার এই হামলাকে একটি কাপুরুষোচিত কাজ হিসেবে অভিহিত করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই উগ্রবাদ এবং ধর্মীয় উম্মাদনাকে প্রশ্রয় দেবে না। হামলার পরপরই বন্ডাই বিচ এবং এর আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়েছে। পুলিশ বলছে, তারা সাজিদ আকরামের ঘর থেকে বেশ কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, যা তদন্তে বড় ভূমিকা রাখবে। সিডনি শহরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, এই ঘটনার শেকড় কতদূর বিস্তৃত তা জানার জন্য তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই ঘটনায় উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সিডনি জুড়ে শোকের ছায়া ও নিরাপত্তা সতর্কতা
এই মর্মান্তিক হামলার পর সিডনি শহর জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের স্মরণে মানুষ বন্ডাই সৈকতের আশেপাশে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই ধরনের হামলা ঠেকাতে ভবিষ্যতে জনবহুল স্থানে আরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা এবং সশস্ত্র প্রহরী মোতায়েন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আপাতত সিডনির সকল সৈকতে বিশেষ সতর্কতা জারি রয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।








