বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বর্তমানে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় বিনিয়োগকারী, সবার চোখ এখন হলুদ ধাতুর এই দামি উজ্জ্বলতার দিকে। গত এক বছরের হিসাব করলে দেখা যায়, স্বর্ণের দাম যে হারে বেড়েছে, তা বাংলাদেশের অন্য কোনো বিনিয়োগ মাধ্যমে কল্পনা করাও অসম্ভব।
বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২,৬২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ মাত্র এক বছর আগে এই একই মানের স্বর্ণের দাম ছিল ১,৪১,০০০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে প্রতি ভরিতে দাম বেড়েছে ১,২১,০০০ টাকা। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন এই দাম বাড়ছে, ভবিষ্যতে দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে এবং এখন কি আপনার স্বর্ণ কেনা বা বিক্রি করা উচিত কি না।
কেন স্বর্ণে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে আকর্ষণীয়?
বাংলাদেশে বর্তমানে জমি, ফ্ল্যাট বা সঞ্চয়পত্রের মতো অনেক বিনিয়োগের খাত থাকলেও স্বর্ণের মতো মুনাফা আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এক বছরে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ১ লাখ টাকা রিটার্ন পাওয়া যায় এমন কোনো আইনি বিনিয়োগ পণ্য দেশে নেই।
যদিও বাংলাদেশে সরাসরি গোল্ড বারে বিনিয়োগ করার সুযোগ নেই, তবুও মানুষ অলংকার কিনেই বিনিয়োগ করছেন। অলংকার তৈরির সময় ভ্যাট ও মজুরি বাবদ প্রায় ১১ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ হলেও, বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী সেই খরচ বাদ দিলেও মুনাফার পাল্লা অনেক ভারী। তাই মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সবার কাছেই স্বর্ণ এখন একটি ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা ও স্বর্ণের বাজার
স্বর্ণের দাম সাধারণত কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর করে না, এটি সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। যখনই বিশ্বে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজার থেকে টাকা তুলে স্বর্ণে বিনিয়োগ শুরু করেন। কারণ স্বর্ণের মান কখনো শূন্য হয় না।
সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রভাব
- ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: ইরানে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কঠোর অবস্থান তেলের বাজারসহ সামগ্রিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
- নিরাপদ আশ্রয়: বিনিয়োগকারীরা যখনই যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করেন, তখনই তারা স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। এরই ফলে বিশ্ববাজারে সোমবার প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫,০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের বাজারে এর সরাসরি প্রভাব
বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার সাথে সাথে দেশের বাজারেও এর উত্তাপ ছড়িয়েছে। আজকেই ভরিতে দাম বেড়েছে ১,৫০০ টাকা। তবে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সূত্রমতে, আগামীকাল মঙ্গলবার এক লাফে ভরিপ্রতি দাম ৫,২৪৯ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়াবে ২,৬২,৪৪০ টাকা।
এই পরিস্থিতি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য চিন্তার কারণ হলেও যারা আগে স্বর্ণ কিনে রেখেছিলেন, তাদের জন্য এটি বড় একটি সুযোগ। লাভের হিসাব এখন প্রায় প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে।
পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি করবেন নাকি ধরে রাখবেন?
অনেকেই ভাবছেন এই চড়া দামে পুরোনো অলংকার বিক্রি করে দেবেন কি না। আপনি যদি ১০ বছর আগে ৭০,০০০ টাকায় এক ভরি স্বর্ণ কিনে থাকেন, তবে বর্তমান বাজারে তা বিক্রি করলে আপনি প্রায় ২,১৭,০০০ টাকা পাবেন। অর্থাৎ ভরিতে আপনার নিট মুনাফা হবে ১,৪৭,০০০ টাকা।
পুরোনো অলংকার বিক্রির নিয়ম
জুয়েলার্সরা সাধারণত পুরোনো স্বর্ণ কেনার সময় ওজন যাচাই করে এবং ক্যারেট নিশ্চিত করে। বর্তমান বাজার মূল্য থেকে সাধারণত ১৭ শতাংশ বাদ দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। দাম যেহেতু টানা বাড়ছে, তাই আজ বিক্রি করার চেয়ে কয়েক দিন অপেক্ষা করা লাভজনক হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।
২০২৬ সালের ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: দাম কোথায় গিয়ে থামবে?
স্বর্ণের দাম কি আরও বাড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বড় বড় বিনিয়োগ ব্যাংকের পূর্বাভাসে চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে।
- গোল্ডম্যান স্যাকস (Goldman Sachs): প্রভাবশালী এই ব্যাংকটির মতে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫,৪০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। তাদের আগের পূর্বাভাস ছিল ৪,৯০০ ডলার।
- লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (LBMA): তাদের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৭,১৫০ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে। তাদের মতে, এ বছর স্বর্ণের গড় দাম থাকবে ৪,৭৪২ ডলারের আশেপাশে।
- রস নরম্যান (Ross Norman): এই স্বাধীন বিশ্লেষকের মতে, চলতি বছরেই স্বর্ণের দাম ৬,৪০০ ডলারে উঠতে পারে।
কাকতালীয়ভাবে করোনাকালে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ২,০০০ ডলার। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে তা ৫,০০০ ডলারে পৌঁছেছে— যা কয়েক বছর আগে কারোর কল্পনায় ছিল না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: আপনি কী করবেন?
বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি করে মুনাফা নেওয়ার এটি একটি উপযুক্ত সময়। তবে আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারী হন, তবে দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অপেক্ষা করতে পারেন। মনে রাখবেন, স্বর্ণে বিনিয়োগে যেমন বড় লাভ আছে, তেমনি বিশ্ব পরিস্থিতির উন্নতি হলে দামে বড় ধরনের সংশোধনেরও ঝুঁকি থাকে। তাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।
স্বর্ণের দাম নিয়ে প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: বর্তমানে বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি কত?
উত্তর: ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ২,৬২,০০০ টাকা। তবে আগামীকাল এটি ২,৬২,৪৪০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
প্রশ্ন: এক আউন্স স্বর্ণ সমান কত ভরি?
উত্তর: আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ আউন্স হিসেবে বিক্রি হয়। ১ আউন্স সমান প্রায় ২.৪৩০ ভরি (বাংলাদেশি পরিমাপে)।
প্রশ্ন: স্বর্ণের দাম কেন এতো দ্রুত বাড়ছে?
উত্তর: বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা, মার্কিন ডলারের মানের পরিবর্তন এবং বড় বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজার ছেড়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ করার ফলে এর দাম দ্রুত বাড়ছে।
প্রশ্ন: পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি করলে কত শতাংশ টাকা কাটা হয়?
উত্তর: সাধারণত বাংলাদেশের জুয়েলার্সরা পুরোনো স্বর্ণ কেনার সময় বর্তমান বাজার মূল্য থেকে ১৭ শতাংশ টাকা বাদ দিয়ে হিসাব করে।
প্রশ্ন: ১৮ ক্যারেট না ২২ ক্যারেট, কোন স্বর্ণে বিনিয়োগ লাভজনক?
উত্তর: বিনিয়োগের জন্য ২২ ক্যারেট স্বর্ণই সবচেয়ে উত্তম। কারণ এর বিশুদ্ধতা বেশি এবং পুনরায় বিক্রি করার সময় ভালো দাম পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: স্বর্ণে বিনিয়োগ করলে কি কোনো ঝুঁকি আছে?
উত্তর: স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ বলা হয়। তবে বিশ্ব পরিস্থিতির হঠাৎ উন্নতি হলে বা যুদ্ধ থামলে দাম কিছুটা কমতে পারে, যা স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি হতে পারে।
প্রশ্ন: স্বর্ণের অলংকার নাকি গোল্ড বার কোনটি কেনা ভালো?
উত্তর: বাংলাদেশে গোল্ড বার বা কয়েন সরাসরি বিক্রির ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তবে সম্ভব হলে অলংকারের চেয়ে বিস্কুট বা কয়েন কেনা লাভজনক, কারণ এতে মজুরি খরচ কম থাকে।
প্রশ্ন: ২০২৬ সালের শেষে স্বর্ণের দাম কত হতে পারে?
উত্তর: গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মতে, ২০২৬ সালের শেষে প্রতি আউন্স ৫,৪০০ ডলার ছাড়াতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের বাজারে ভরি ৩ লাখ টাকাও ছাড়াতে পারে।
প্রশ্ন: হলমার্ক করা স্বর্ণ কি কেনা বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ, স্বর্ণের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে সঠিক দামে বিক্রির নিশ্চয়তা পেতে অবশ্যই হলমার্ক করা স্বর্ণ কেনা উচিত।
প্রশ্ন: স্বর্ণ কি এখনই বিক্রি করা উচিত?
উত্তর: আপনার যদি জরুরি অর্থের প্রয়োজন হয়, তবে এখন বিক্রি করলে বড় মুনাফা পাবেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় দীর্ঘ মেয়াদে অপেক্ষা করা আরও বেশি লাভজনক হতে পারে।








