আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে যা ঘটছে, তাকে এক কথায় ‘রোলার কোস্টার রাইড’ বলা যেতে পারে। রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্বর্ণের দামে দেখা দিয়েছে স্মরণকালের অন্যতম বড় ধস। শুক্রবার দিবাগত রাতে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৮.২২ শতাংশ কমে গেছে।
রেকর্ড ছোঁয়ার পরেই কেন এই ধস?
গত বৃহস্পতিবার সকালেও বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ৫,৫৫০ ডলারের উপরে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। কিন্তু সেই রেকর্ড বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। শুক্রবার রাত ২টা ৩০ মিনিটে স্পট গোল্ডের দাম নেমে আসে প্রতি আউন্স ৪,৮৯০ ডলারে।
হিসাব করলে দেখা যায়, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম কমেছে প্রায় ৬৬০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮০,৫০০ টাকারও বেশি। এত অল্প সময়ে স্বর্ণের দামে এমন পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
দাম কমার পেছনে মূল কারণ গুলো কী?
স্বর্ণের বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে বেশ কিছু ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
- ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে টানাপোড়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছিলেন। ফলে দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
- প্রফিট বুকিং: দাম যখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন বড় বিনিয়োগকারীরা তাদের স্বর্ণ বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেন। একে বাজার বিশ্লেষণে ‘প্রফিট বুকিং’ বলা হয়। যখন সবাই একসাথে স্বর্ণ বিক্রি শুরু করে, তখন বাজারে দাম দ্রুত কমতে থাকে।
- বিনিয়োগকারীদের কৌশল পরিবর্তন: অনেকে মনে করছেন, অতিরিক্ত দাম বাড়ার পর বাজারে একটি বড় ধরনের ‘কারেকশন’ বা সমন্বয় হওয়ার প্রয়োজন ছিল, যা এই পতনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাব কেমন হতে পারে?
বিশ্ববাজারে যখন স্বর্ণের দাম কমে, তখন সাধারণত তার প্রভাব কয়েকদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের বাজারেও পড়ে। বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। আন্তর্জাতিক বাজারে আউন্সপ্রতি ৮০ হাজার টাকা কমে যাওয়া মানে হলো প্রতি ভরি স্বর্ণের দামেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক বাজারে ১ আউন্স সমান প্রায় ২.৬৬৭ ভরি। সেই হিসেবে প্রতি ভরিতেও কয়েক হাজার টাকা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই বিশ্ববাজারের দরপতন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন করণীয় কী?
স্বর্ণের বাজার বর্তমানে বেশ অস্থির। যারা নতুন করে স্বর্ণ কিনতে চান বা বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য বাজার পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।
১. তাড়াহুড়ো না করা: দাম কমার এই প্রবণতা কতক্ষণ স্থায়ী হয় তা দেখা প্রয়োজন।
২. বাজুসের ঘোষণার অপেক্ষা: বাংলাদেশের বাজারে অফিসিয়াল দাম কমার ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
৩. দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা: স্বর্ণে বিনিয়োগ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হয়, তাই সাময়িক অস্থিরতায় আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের এই বড় পতন কি আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি আবার দাম বাড়তে শুরু করবে, তা নির্ভর করছে বিশ্ব রাজনীতির মোড় কোন দিকে ঘোরে তার ওপর। তবে বর্তমানে স্বর্ণের দামে এই ধস সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে আসতে পারে।








