ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আলোচনার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যদি ইরান সমঝোতায় না আসে, তবে আগের চেয়েও ভয়াবহ হামলার মুখে পড়তে পারে দেশটি। অন্যদিকে, ইরানও দমে যাওয়ার পাত্র নয়, তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে কোনো হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে তাদের ‘আঙুল এখন ট্রিগারে’। যদি সত্যি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তার ফলাফল কী হতে পারে? বিবিসির প্রতিবেদন ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু সম্ভাব্য চিত্র উঠে এসেছে।
সীমিত হামলা এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন
মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী ইরানের সামরিক ঘাঁটি, বিশেষ করে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং বাসিজ ইউনিটের ওপর নিখুঁত বা ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালাতে পারে। লক্ষ্য হতে পারে পারমাণবিক কেন্দ্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই হামলার ফলে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে দেশটিতে গণতন্ত্রে উত্তরণ হতে পারে।
শাসনব্যবস্থা টিকে থাকা কিন্তু নীতি বদল
একে বলা হচ্ছে ‘ভেনিজুয়েলা মডেল’। এক্ষেত্রে মার্কিন পদক্ষেপের ফলে শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলেও তারা তাদের আক্রমণাত্মক নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসার মতো শর্ত মেনে নিতে পারে ইরান।
সামরিক শাসনের উত্থান
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, মার্কিন হামলার পর ইরানে অরাজকতা দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত দেশটি একটি শক্তিশালী সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এতে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে উঠবে এবং পুরো রাষ্ট্রটি সেনাশাসিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রতিবেশীদের ওপর পাল্টা আক্রমণ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, হামলা হলে তারা চুপ করে বসে থাকবে না। পারস্য উপসাগরে বাহরাইন বা কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এছাড়া জর্ডান বা সৌদি আরবের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে তেহরান।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও নৌ-যুদ্ধ
ইরানের অন্যতম বড় শক্তি হলো তাদের গতিশীল নৌ-তৎপরতা। সংকীর্ণ উপসাগরীয় এলাকায় তারা দ্রুতগতিতে একের পর এক হামলা চালিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এমনকি মার্কিন নৌ-সেনাদের বন্দি করার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে।
দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ ও চরম বিশৃঙ্খলা
সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা হলো সিরিয়া, ইয়েমেন বা লিবিয়ার মতো ইরানেও দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া। যদি কেন্দ্রীয় শাসন ভেঙে পড়ে, তবে কুর্দি বা বেলুচিদের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রক্ষার দোহাই দিয়ে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে দেশটিতে চরম জাতিগত দাঙ্গা ও অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ মানে কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি এবং ইরানের অনড় অবস্থান বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে সমাধান আসে নাকি রণক্ষেত্রে, তা সময় বলে দেবে।








