পৌষের মাঝামাঝি সময়ে এসে রাজধানী ঢাকায় জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। কনকনে ঠান্ডায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জনজীবন। জবুথবু অবস্থায় সাধারণ মানুষকে করতে হচ্ছে দৈনন্দিন কাজকর্ম। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ এবং স্কুল-কলেজ ও অফিসগামী যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। হঠাৎ করে ঢাকায় শীতের তীব্রতা এত বেড়ে যাওয়ার কারণ কী এবং কবে নাগাদ এই ঠান্ডা থেকে রেহাই মিলবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ঢাকার আকাশ ছিল ঘন কুয়াশা ও মেঘে ঢাকা, সারাদিন সূর্যের দেখা মেলেনি বললেই চলে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তাপমাত্রার অদ্ভুত আচরণের কারণেই শীতের অনুভূতি এত তীব্র হয়েছে। চলুন জেনে নিই আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিশ্লেষণ এবং আগামী কয়েকদিনের পূর্বাভাস।
ঢাকায় তীব্র শীত অনুভূত হওয়ার প্রধান কারণ কী?
সাধারণত শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার ঢাকায় শীতের অনুভূতি বা ‘ফিল লাইক’ (Feels Like) তাপমাত্রা অনেক কম মনে হচ্ছে। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ খো. হাফিজুর রহমান। তিনি ঢাকা পোস্টকে জানান, ঢাকায় তীব্র শীত অনুভূত হওয়ার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে।
সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়া
শীত বেশি অনুভূত হওয়ার অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ হলো দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়া। একে আবহাওয়ার ভাষায় ‘Diurnal Range of Temperature’ বলা হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান বা পার্থক্য ছিল মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সাধারণত, দিনের বেলায় সূর্য ওঠার পর তাপমাত্রা বাড়ে এবং রাতে কমে। কিন্তু যখন দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ৫ ডিগ্রির নিচে চলে আসে, তখন শীতের অনুভূতি তীব্র হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই ব্যবধান যত কম হবে, শীতের অনুভূতি তত বেশি তীব্র হবে। মূলত এই ২ ডিগ্রি ব্যবধানের কারণেই তাপমাত্রা খুব বেশি নিচে না নামলেও রাজধানীবাসী হাড়কাঁপানো শীত অনুভব করছেন।
সূর্যের দেখা না পাওয়া ও মেঘলা আকাশ
দ্বিতীয় কারণটি হলো সূর্যের অনুপস্থিতি। গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার আকাশ ঘন কুয়াশা ও মেঘে ঢাকা থাকছে। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা হিমেল বাতাস এবং কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে দিনের বেলাতেও চারপাশ ঠান্ডা থাকছে এবং মাটি ও পরিবেশ উষ্ণ হতে পারছে না। সূর্যের তাপের অভাবেই এই কনকনে ভাবটি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
বৃষ্টির পূর্বাভাস ও ঘন কুয়াশার সতর্কতা
শীতের এই তীব্রতার মধ্যেই নতুন করে বৃষ্টির পূর্বাভাসের কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস, যা শীতের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। মঙ্গলবার সকালের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আবহাওয়ার এই বিরূপ পরিস্থিতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আগামীকালের বৃষ্টির সম্ভাবনা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামীকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকাল ৯টার মধ্যে সারাদেশের কোথাও কোথাও হালকা থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে। শীতের মধ্যে বৃষ্টি হলে বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যায় এবং ঠান্ডা আরও বেশি অনুভূত হয়। এই বৃষ্টিপাত মূলত পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘন কুয়াশায় ব্যাহত হতে পারে যোগাযোগ ব্যবস্থা
আবহাওয়া অফিস বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত এই কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে।
ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা (Visibility) কমে আসায় নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে:
- নৌ-পরিবহন: ফেরি চলাচল এবং লঞ্চ সার্ভিস কুয়াশার কারণে মাঝনদীতে আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
- সড়ক যোগাযোগ: মহাসড়কগুলোতে দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় গাড়ি চলাচলে ধীরগতি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই চালক ও যাত্রীদের সাবধানে এবং ফগ লাইট ব্যবহার করে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কবে কমবে শীতের এই তীব্রতা?
টানা এই শীতে যারা কাবু হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য কিছুটা আশার বাণী শুনিয়েছে আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়াবিদ খো. হাফিজুর রহমান জানান, আগামী শুক্রবার নাগাদ শীতের এই তীব্রতা কিছুটা কমে আসতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, শুক্রবারের পর আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন সূর্যের দেখা মিললে দিনের তাপমাত্রা বাড়বে এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধানও বাড়বে। ফলে শীতের অনুভূতি সহনীয় পর্যায়ে আসবে। তবে কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে ‘কোল্ড ডে’ (Cold Day) কন্ডিশন আরও দুই-একদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
জনজীবনে শীতের প্রভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন ছিন্নমূল ও খেটে খাওয়া মানুষ। গরম কাপড়ের অভাবে ফুটপাত ও বস্তিবাসী মানুষের দুর্ভোগ চরমে। অন্যদিকে, ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপও বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে।
- শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: তীব্র শীতে শিশুদের নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস এবং কোল্ড ডায়রিয়ার (রোটা ভাইরাস) প্রকোপ বাড়ছে। শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর চাপ বেড়েছে।
- বয়স্কদের সমস্যা: বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা এবং বাতব্যথা বেড়ে যাচ্ছে।
- সতর্কতা: চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই সময়ে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া, গরম কাপড় পরিধান করা, এবং কুসুম গরম পানি পান করা উচিত। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের কান ও গলা ঢেকে রাখা জরুরি।
শীত মোকাবিলায় করণীয়
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, যেহেতু আরও কয়েকদিন এই কুয়াশা ও শীত থাকবে, তাই আমাদের কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি:
১. গরম কাপড়: বাইরে বের হলে অবশ্যই পর্যাপ্ত গরম কাপড়, মাফলার এবং কানটুপি ব্যবহার করুন।
২. মাস্ক ব্যবহার: কুয়াশা ও ধুলোবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করুন, এটি শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা করবে।
৩. যানবাহন চালনা: ঘন কুয়াশায় হেডলাইট জ্বালিয়ে এবং ধীরগতিতে গাড়ি চালানো উচিত। ৪. আগুন পোহানোয় সতর্কতা: গ্রামের দিকে বা শহরের ফুটপাতে অনেকে আগুন পোহান। অসতর্কতার কারণে যেন দুর্ঘটনা না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
পরিশেষে, আবহাওয়া পরিবর্তনশীল। শুক্রবার পর্যন্ত এই তীব্র শীত সহ্য করতে হবে রাজধানীবাসীকে। বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হলে আবারও ঝলমলে রোদের দেখা মিলবে এবং জনজীবন স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা যায়।
ঢাকায় হাড়কাঁপানো শীত কেন সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: ঢাকায় আজ কেন এতো শীত?
উত্তর: ঢাকায় আজ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সূর্যের আলো না থাকায় শীতের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
প্রশ্ন: ঢাকায় শীত কবে কমবে?
উত্তর: আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, আগামী শুক্রবার (২ জানুয়ারি) নাগাদ শীতের তীব্রতা কিছুটা কমে আসতে পারে এবং তাপমাত্রা বাড়তে পারে।
প্রশ্ন: কাল কি বৃষ্টি হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামীকাল (বুধবার) সকাল ৯টার মধ্যে দেশের কোথাও কোথাও হালকা বা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশ্ন: আজকের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কত?
উত্তর: আজ (মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর) রাজধানী ঢাকায় রেকর্ডকৃত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রশ্ন: কোল্ড ডে (Cold Day) কী?
উত্তর: যখন দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায় এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান খুব কমে আসে, তখন তাকে ‘কোল্ড ডে’ কন্ডিশন বলা হয়।
প্রশ্ন: কুয়াশা কতদিন থাকবে?
উত্তর: আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২-৩ দিন মধ্যরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে।
প্রশ্ন: শৈত্যপ্রবাহ কি চলছে ঢাকায়?
উত্তর: তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে তাকে শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। ঢাকায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির উপরে থাকলেও তাপমাত্রার ব্যবধান কম হওয়ায় শৈত্যপ্রবাহের মতো ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে।
প্রশ্ন: শীতের কারণে কি স্কুল বন্ধ?
উত্তর: এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ঢাকায় স্কুল বন্ধের কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে আঞ্চলিকভাবে স্কুল বন্ধের নিয়ম রয়েছে।
প্রশ্ন: শীতের তীব্রতা বাড়ার কারণ কী?
উত্তর: উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা হিমেল বাতাস, ঘন কুয়াশা এবং সূর্যের তাপ ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে না পারাই শীতের তীব্রতা বাড়ার মূল কারণ।
প্রশ্ন: ঘন কুয়াশায় গাড়ি চালানোর নিয়ম কী?
উত্তর: ঘন কুয়াশায় অবশ্যই ফগ লাইট বা হেডলাইট জ্বালিয়ে (লো বিম), ধীরগতিতে এবং সামনের গাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে গাড়ি চালানো উচিত।








