মার্কিন শিশুদের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তারা দিনে গড়ে ৫ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, আচরণ ও শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকরা শিশুর বুদ্ধি ও আবেগীয় বিকাশের জন্য স্ক্রিনমুক্ত আটটি অভ্যাস নির্দেশ করেছেন। এই অভ্যাসগুলো শিশুর মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, সামাজিক দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকে উন্নত করে।
১. খাওয়ার সময় ফোন নয়
পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। খাওয়ার সময় ফোন ব্যবহার না করা শিশুকে একে অপরের সঙ্গে কথোপকথনে উৎসাহী করে তোলে। এটি শিশুর ভাষাগত দক্ষতা ও আবেগীয় সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে।
হার্ভার্ড টি.ভি. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ ২০১৯ সালে পরিচালিত ফ্যামিলি ডিনার প্রজেক্ট-এ দেখা গেছে, নিয়মিত একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস শিশুর মানসিক স্থিরতা ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নত করে।
২. বাইরে ঘুরতে বের হোন
বাইরে খেলাধুলা ও ঘোরাফেরা শিশুদের সৃজনশীলতা ও সংবেদনশীলতা বাড়ায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটা ও পার্কে বেড়ানো শিশুর পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান ও নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ২০২১ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরিতে সহায়ক।
৩. বই পড়ুন ও গল্প শোনান
বই পড়া শিশুর শব্দভান্ডার ও কল্পনাশক্তি বাড়ায়। একসঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস শিশুর ভাষাগত দক্ষতা ও সহমর্মিতা উন্নত করে।
হার্ভার্ড সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড ২০১৯ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, একসঙ্গে বই পড়ার সময় মস্তিষ্কের অনেক অঞ্চল সক্রিয় থাকে। এটি শিশুর বোধগম্যতা ও সহানুভূতি বাড়ায়।
৪. খেলাধুলা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম
ব্লক, পাজল ও বিভিন্ন খেলনা শিশুর ফাইন মোটর স্কিল, যুক্তি ব্যবহার ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এডুকেশন ২০২০ সালের দ্য পাওয়ার অব প্লে গবেষণায় বলা হয়েছে, খেলাধুলা শিক্ষার জন্য বিরতি নয়, বরং শিক্ষার ভিত্তি। খেলাধুলা শিশুকে পরিকল্পনা, মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখায়।
৫. সামাজিকতা ও পারস্পরিক আলোচনা
শিশুরা পরিচিত ও অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বললে সামাজিক দক্ষতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়। এটি শিশুকে সমাজে সহজে মিশতে সহায়তা করে এবং অবসাদ ও বিষণ্নতা কমায়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটালে এসব উন্নতির সুযোগ কমে যায়।
৬. শোবার আগে স্ক্রিন ব্যবহার সীমিত করুন
স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমোন মেলাটোনিন নিঃসরণে বাধা দেয়।
শোবার অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন, টিভি ও কম্পিউটার বন্ধ করুন। স্বাস্থ্যকর ঘুম শিশুর স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগ বাড়ায়।
৭. স্ক্রিনমুক্ত সময় বা দিন পালন করুন
নিয়মিত স্ক্রিনমুক্ত সময় বা দিন পালন শিশুরা খেলাধুলা, আঁকাআঁকি ও বই পড়ার মাধ্যমে বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়।
স্ক্রিনমুক্ত অভ্যাস পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং শিশুর মনোবল ও মনোযোগ বাড়ায়।
৮. স্ক্রিনের পরিমিত ব্যবহার
শিশুদের স্ক্রিন পরিমিতভাবে ব্যবহার করতে উৎসাহ দিন। সামাজিক মাধ্যম ও গেমসের গুণগত মানকে গুরুত্ব দিন।
শিশুকে শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখার জন্য উৎসাহিত করুন। মেডিটেশন ও মাইন্ডফুল ব্রিদিংয়ের মাধ্যমে শিশুকে মনঃসংযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখানো যায়।
হার্ভার্ড গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট এই অভ্যাসগুলো করে, তারা অন্যদের তুলনায় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এগিয়ে থাকে।
স্ক্রিনের প্রভাব সর্বব্যাপী হলেও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা শিশুর বুদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অপরিহার্য। স্ক্রিনমুক্ত অভ্যাস শিশুদের শেখা, সামাজিকতা এবং আবেগীয় বিকাশে সাহায্য করে।








