মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আবারও উত্তপ্ত হাওয়া বইছে। সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল শোধনাগার ‘আরামকো’তে ড্রোন হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। প্রাথমিকভাবে এই হামলার দায় ইরানের ওপর চাপানো হলেও, এখন উঠে আসছে এক বিস্ফোরক তথ্য। ইরানের দাবি, এই হামলা তারা করেনি; বরং ইসরাইল ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ছদ্মবেশে এই অপারেশন চালিয়েছে।
আরামকোতে হামলা: আসলে কী ঘটেছিল
গত সোমবার (২ মার্চ), সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে অবস্থিত রাস তানুরা রিফাইনারিতে ড্রোন আঘাত হানে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা। হামলার পরপরই সেখানে আগুন ধরে যায় এবং কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। যদিও আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এই ঘটনা বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে।
‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন কী? ইরানি সূত্রের দাবি
ইরানের সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আরামকোতে এই হামলা আসলে ইসরাইলের একটি পরিকল্পিত ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন।
ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন কেন করা হয়?
- দৃষ্টি ঘোরানো: অন্য কোনো দেশে (যেমন ইরান) হামলার অপরাধ থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরাতে।
- উস্কানি দেওয়া: দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ফায়দা হাসিল করা।
- ভুল তথ্য ছড়ানো: প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে অন্য কারো ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরাইলি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিলেও, আরামকো তাদের টার্গেট তালিকায় ছিল না। তাদের মতে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে যাতে আরব দেশগুলোর সাথে ইরানের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
পরবর্তী লক্ষ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত
ইরানের গোয়েন্দা সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর। আরামকোর মতো এখানেও ছদ্মবেশে হামলার পরিকল্পনা করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরান। যদি এমনটা ঘটে, তবে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি
সৌদি আরামকো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। রাস তানুরার মতো গুরুত্বপূর্ণ শোধনাগারে হামলার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকে তবে:
- অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে অনেক বেড়ে যেতে পারে।
- পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে।
- আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা মধ্যপ্রাচ্যে বিনিয়োগ করতে ভয় পাবেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনীতি
ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে হামলার কথা স্বীকার করা হলেও, দায় কার তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। একদিকে ইরান নিজেদের নির্দোষ দাবি করছে, অন্যদিকে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো আঙুল তুলছে তেহরানের দিকে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাঝে সৌদি আরব বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে।
সৌদি আরামকোতে হামলা কি কেবল একটি সামরিক অপারেশন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ হামলার এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যাবে। এখন দেখার বিষয় সৌদি আরব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়।








