আমপ্রেমীদের জন্য চলে এলো বছরের সবচেয়ে বড় সুখবর। আম রিলিজের অফিশিয়াল ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের যৌথ সিদ্ধান্তে গত ১৫ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গাছ থেকে পাড়া হচ্ছে সাতক্ষীরার বিখ্যাত সুমিষ্ট হিমসাগর আম। দীর্ঘ ছয় মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি আর নিবিড় পরিচর্যার পর বাগানগুলোতে এখন ঝুলছে পরিপক্ব ও বিষমুক্ত আম। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সাতক্ষীরার হিমসাগর আম এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকার ও আড়তদাররা সাতক্ষীরায় ভিড় করতে শুরু করেছেন।
ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুগত সুবিধার কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে সাতক্ষীরার আম একটু আগেই পেকে থাকে। এর আগে মে মাসের শুরুতে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ ও বোম্বাই আম বাজারে এলেও, ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ থাকে এই হিমসাগরের ওপর।
আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও বিশাল কর্মযজ্ঞ
সাতক্ষীরার হিমসাগর আমের চাহিদা এখন আর শুধু দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর স্বাদ ও সুবাস পৌঁছে গেছে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উন্নত দেশগুলোতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মরসুমে জেলায় আম চাষকে কেন্দ্র করে এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে:
- মোট আম বাগানের সংখ্যা: ৫ হাজার ২৯৯টি।
- আম চাষের মোট জমি: ৪ হাজার ৪শ’ হেক্টর।
- সরাসরি যুক্ত আম চাষি: ১৩ হাজার ১০০ জন।
- মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা: ৭০ হাজার মেট্রিক টন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ৭০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬০ শতাংশই পূরণ হবে কেবল হিমসাগর আম থেকে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেনের মতে, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে এবং চলতি মরসুমে জেলায় আমের কেনা-বেচা প্রায় ৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাগানের আজকের বাজারদর ও শ্রমিকের পারিশ্রমিক
সাতক্ষীরা সদরের কুখরালী গ্রামের অভিজ্ঞ আম চাষি হাফিজুর রহমান খোকা জানান, এবার আমের সাইজ ও মান দুটোই খুব ভালো হয়েছে। তিনি সরাসরি বাগান থেকে প্রতি মণ আম ৩ হাজার টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করছেন। তবে দেশের বিভিন্ন শহরের খুচরা বাজারে পরিবহন খরচের কারণে এর দাম কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
এই আম মরসুমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় স্তরে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। বাগানে কাজ করা শ্রমিকরা জানান, আম পাড়া, প্যাকিং ও বাজারজাতকরণের কাজ করে তারা প্রতি মাসে প্রায় ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, যা তাদের জীবিকা নির্বাহে বড় যোগান দিচ্ছে।
আম রপ্তানি ও বিমান ভাড়ার বড় চ্যালেঞ্জ
ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার বাগান পরিদর্শনে আসা শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘জিএন ইন্টারন্যাশনাল’-এর মালিক রাসেল আহমেদ বলেন, “সাতক্ষীরার হিমসাগর আমের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক সুনাম রয়েছে। সরাসরি বাগান থেকে আম সংগ্রহ করলে যেমন শতভাগ নিরাপদ ও ফরমালিনমুক্ত আম পাওয়া যায়, তেমনি চাষিরাও ন্যায্য দাম পান।”
তবে তিনি একটি বড় সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এবার বিদেশে আম পাঠানোর ক্ষেত্রে বিমান ভাড়া (কার্গো ফেয়ার) কিছুটা বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজারে দেশের আমের সুনাম ধরে রাখতে এবং রপ্তানি সচল রাখতে সরকারের কাছে বিমান ভাড়া কমানোর জোর দাবি জানিয়েছেন আম রপ্তানিকারকরা।
প্রয়োজন আধুনিক সংরক্ষণাগার ও বিশেষ গবেষণা কেন্দ্র
সাতক্ষীরার আম চাষি ও কৃষি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী কোল্ড স্টোরেজ বা আম সংরক্ষণাগারের দাবি জানিয়ে আসছেন। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, সাতক্ষীরায় আম সংরক্ষণাগার নির্মাণের পাশাপাশি যদি একটি বিশেষ আম গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেত, তবে আমের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বহুগুণ বেড়ে যেত। এতে আম পচে নষ্ট হওয়ার লোকসান থেকে চাষিরা বাঁচতেন এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতো।
কোনো বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার সাতক্ষীরার আম চাষিরা লাভের মুখ দেখবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সাতক্ষীরার হিমসাগর আম এই খবরটি নিশ্চিতভাবেই সাধারণ ক্রেতাদের স্বস্তি দেবে। তবে কেমিক্যালমুক্ত ও আসল হিমসাগর আম চিনে কেনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আন্তর্জাতিক রুটে পরিবহন খরচ কমাতে পারলে এই হিমসাগর আম দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে।








