রমজান মাস আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস। এই পবিত্র মাসে রোজা পালন অবস্থায় আমাদের দৈনন্দিন অনেক কাজ নিয়েই মনে নানা প্রশ্ন জাগে। এর মধ্যে অন্যতম একটি প্রশ্ন হলো রোজা অবস্থায় টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করা যাবে কি? মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা হলেও রোজা অবস্থায় টুথপেস্ট বা মাজন ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরিয়তের কিছু বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। আজকের প্রতিবেদনে আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
রোজা অবস্থায় ব্রাশ করার মূল বিধান
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজা রেখে দিনের বেলায় টুথপেস্ট, টুথ পাউডার বা মাজন ব্যবহার করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। এর প্রধান কারণ হলো, টুথপেস্ট বা মাজনে বিশেষ ধরনের স্বাদ (মিষ্টি, তিতা বা ঝাঁঝালো) থাকে। রোজা অবস্থায় জিহ্বা দিয়ে কোনো কিছুর স্বাদ গ্রহণ করা বা গলার ভেতর সেই স্বাদ পৌঁছে যাওয়া রোজার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
টুথপেস্ট ব্যবহারে রোজা কি ভেঙে যায়?
শুধুমাত্র টুথপেস্ট মুখে দিলেই রোজা ভেঙে যায় না। তবে এখানে একটি বড় ঝুঁকি থাকে। যদি ব্রাশ করার সময় পেস্টের সামান্য অংশ বা এর স্বাদ অনিচ্ছাকৃতভাবেও গলার ভেতরে (হলকুম) পৌঁছে যায়, তবে ওই ব্যক্তির রোজা ভেঙে যাবে। ফিকহের কিতাবসমূহে বলা হয়েছে:
“রোজাদারের জন্য স্বাদযুক্ত বস্তু ব্যবহার করা মাকরুহ এবং তা গলায় প্রবেশ করলে রোজা নষ্ট হয়ে যায়।” (সূত্র: আল-বাহরুর রায়েক, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭৯)
কেন টুথপেস্ট ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত?
টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করার সময় অনেক ক্ষেত্রে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বিশেষ করে পেস্টের ফেনা গলার ভেতরে চলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তাই ওলামায়ে কেরামগণ পরামর্শ দেন যে:
- স্বাদের প্রভাব: টুথপেস্টের উগ্র স্বাদ জিহ্বায় লাগলে তা রোজার মূল চেতনার পরিপন্থী।
- সতর্কতা: রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত, তাই সামান্য ব্রাশ করার কারণে যেন এই ইবাদত নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
- বিকল্প ব্যবস্থা: ব্রাশ করতে চাইলে সেহরি খাওয়ার পর ফজরের আজানের আগেই তা শেষ করে নেওয়া সবচেয়ে উত্তম।
মেসওয়াক: সুন্নতি ও নিরাপদ সমাধান
রোজা অবস্থায় মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে বা দাঁত পরিষ্কার রাখতে টুথপেস্টের পরিবর্তে মেসওয়াক ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ এবং সওয়াবের কাজ। মেসওয়াক ব্যবহারে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না, বরং এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
হাদিস শরিফে এসেছে:
السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ
‘মেসওয়াক মুখের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ।’ (বুখারি ৮৮৭)
মেসওয়াক করার সময় যদি কাঠির সামান্য আঁশ গলার ভেতর চলে যায় এবং তা অনিচ্ছাকৃত হয়, তবে রোজা ভাঙবে না। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন অতিরিক্ত পানি বা লালা গলার ভেতর না যায়।
রোজা অবস্থায় মুখ পরিষ্কার রাখার টিপস
রমজানে দিনের বেলায় মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে আপনি নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
১. সেহরির পর ব্রাশ করুন
ফজরের আজানের আগেই টুথপেস্ট দিয়ে ভালোভাবে দাঁত ব্রাশ করে নিন। এতে সারাদিন মুখ সতেজ থাকবে এবং রোজা অবস্থায় ব্রাশ করার প্রয়োজন হবে না।
২. মেসওয়াকের অভ্যাস করুন
দিনের বেলায় যখনই মুখ অপছন্দনীয় মনে হবে, তখনই কাঁচা বা শুকনো মেসওয়াক ব্যবহার করুন। এটি দাঁতের মাড়ি শক্ত করে এবং মুখের জীবাণু ধ্বংস করে।
৩. বেশি করে কুলি করুন
অজু করার সময় বা সাধারণ সময়ে ভালো করে কুলি করুন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন গড়গড়া না হয়। গড়গড়া করলে পানি গলার ভেতরে চলে যাওয়ার ভয় থাকে, যা রোজা নষ্ট করতে পারে।
বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতামত
অধিকাংশ মুফতি ও আলেমদের মতে, টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করা সরাসরি হারাম না হলেও এটি ‘মাকরুহে তানজিহি’। অর্থাৎ এটি এড়িয়ে চলাই ঈমানের দাবি। যদি কারো দাঁতে প্রচণ্ড সমস্যা থাকে এবং ডাক্তার ব্রাশ করতে বলেন, তবে তিনি পেস্ট ছাড়া শুধুমাত্র ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু পেস্ট ব্যবহার করলে অবশ্যই শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে যে তা গলার ভেতরে যাবে না।
যদি ভুলবশত পেস্ট পেটে চলে যায়
যদি কেউ রোজা অবস্থায় ব্রাশ করতে গিয়ে ভুল করে পেস্ট গিলে ফেলে, তবে তার ওই দিনের রোজাটি ভেঙে যাবে। এক্ষেত্রে তাকে পরবর্তীতে এই রোজার কাজা আদায় করতে হবে (তবে কাফফারা ওয়াজিব হবে না যদি তা অনিচ্ছাকৃত হয়)।
রোজা অবস্থায় আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। সামান্য টুথপেস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের রোজাটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই দিনের বেলায় টুথপেস্ট ব্যবহার না করে মেসওয়াক ব্যবহার করাই উত্তম ও নিরাপদ।








