রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে আর কোনো নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা থাকবে না যদি পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে এবং দেশটির নিরাপত্তা স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) বার্ষিক বিশেষ অনুষ্ঠান ‘ডিরেক্ট লাইন’-এ দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মান দিলে অভিযান হবে না
অনুষ্ঠানে বিবিসির এক সাংবাদিক পুতিনকে প্রশ্ন করেন, ইউক্রেনের পর রাশিয়া অন্য কোথাও আর কোনো ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বা যুদ্ধ চালাবে কি না। এর জবাবে পুতিন সরাসরি বলেন, “যদি আপনারা আমাদের সম্মান করেন, তবে আর কোনো অভিযান হবে না। আমরা যেভাবে আপনাদের সম্মান করার চেষ্টা করছি, আপনারাও যদি একই মনোভাব পোষণ করেন, তবে যুদ্ধের প্রয়োজন পড়বে না।”
রুশ প্রেসিডেন্ট আরও জানান, ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো পরিকল্পনা রাশিয়ার নেই। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে লড়াই করতে রাশিয়া সব সময় প্রস্তুত আছে।”
ন্যাটোর সম্প্রসারণ ও রাশিয়ার শর্ত
পুতিন অভিযোগ করেন যে, ন্যাটো তাদের পূর্বাঞ্চলীয় সীমানা সম্প্রসারণ নিয়ে রাশিয়ার সাথে প্রতারণা করেছে। তিনি শর্ত দিয়ে বলেন, যদি ন্যাটো আর কোনো সম্প্রসারণ না করে এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে কোনো সংঘাতের সম্ভাবনা থাকবে না। রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পরিকল্পনা স্থায়ীভাবে ত্যাগ করতে হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ
ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে পুতিন বলেন, তিনি ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী। তবে তিনি তার মূল অবস্থান থেকে কোনো আপসের ইঙ্গিত দেননি। পুতিনের দাবিগুলো হলো:
- ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে।
- রাশিয়ার দখল করা চারটি অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।
- দনবাস অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
পুতিন আবারও অভিযোগ করেন যে, পশ্চিমা দেশগুলো আসলে ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রক্সি যুদ্ধ চালাচ্ছে।
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
টানা সাড়ে চার ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে রাশিয়ার অর্থনীতি নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন পুতিন। তিনি স্বীকার করেন যে, দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে। ভ্যাট বৃদ্ধির বিষয়টিও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
পুতিনের এই অনুষ্ঠান চলাকালীনই রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে ১৬ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেয়। তিনি জানান, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এছাড়া প্রবীণ সেনাদের সম্মান এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।
ন্যাটোর ওপর হামলার আশঙ্কা নাকচ
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার দাবি করে আসছে যে, রাশিয়া ভবিষ্যতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে হামলা চালাতে পারে। পুতিন এই আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ‘সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে’ কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ভ্লাদিমির পুতিনের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, রাশিয়া তাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। ইউক্রেন সংকটের সমাধান এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি বজায় রাখা এখন মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পুতিনের এই ‘সম্মানের রাজনীতি’ বিশ্ব পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
সূত্র: বিবিসি








