আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রাতে বিছানায় শুয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা, খবর পড়া কিংবা ভিডিও দেখা অনেকেরই রেগুলার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে রাতে দীর্ঘ সময় ধরে এই ফোন স্ক্রল করার প্রবণতা মানুষের স্বাস্থ্য ও মেজাজের ওপর কতটা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ঘুমের ঠিক পূর্বে স্ক্রিনে একের পর এক উত্তেজনাপূর্ণ বা উদ্বেগজনক খবর দেখার এই বিপজ্জনক অভ্যাসকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ডুমস্ক্রলিং’।
ডুমস্ক্রলিং মস্তিষ্কের ওপর কীভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে?
প্রতিদিনই মানব মস্তিষ্ক অগণিত তথ্য গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করে। রাতের ঘুমের সময় মস্তিষ্ক এসব তথ্য প্রক্রিয়া করে নিজেকে রিফ্রেশ করার সুযোগ পায়। তবে ঘুমানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ফোন ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের এই স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া থমকে যায়।
নীল আলো ও মেলাটোনিন ক্ষরণ হ্রাস
- হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত ক্ষতিকর নীল আলো (Blue Light) মানবদেহের প্রাকৃতিক ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ‘মেলাটোনিন’ উৎপাদনে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে।
- ঘুমে বিঘ্ন: পর্যাপ্ত মেলাটোনিন নিঃসৃত না হলে সময়মতো ঘুম আসে না এবং ঘুমের স্থায়িত্ব ও মান আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
মস্তিষ্কের অতিরিক্ত সক্রিয়তা
দ্রুত পরিবর্তনশীল ও নেতিবাচক কনটেন্ট মস্তিষ্ককে শান্ত হতে না দিয়ে সার্বক্ষণিক সতর্ক ও উত্তেজিত অবস্থায় রাখে। ফলে রাতে ঘুমাতে গেলেও মস্তিষ্ক তার প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পায় না।
ব্রেন ফগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
নিয়মিত রাতে মানসম্মত ঘুম না হলে পরদিন এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার ওপর।
- ব্রেন ফগ (Brain Fog): পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা ভার লাগা, মনোযোগের চরম অভাব, কাজে বিরক্তি এবং চিন্তা প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ব্রেন ফগ’ বলা হয়।
- ক্লান্তি ও বিষণ্ণতা: ঘুমে ব্যঘাত ঘটার কারণে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অফিসে বা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে না পারা এবং মানসিক ক্লান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।
“অতিরিক্ত ডুমস্ক্রলিং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে।”
ডা. শ্রীলক্ষ্মী এন (নিউরোলজিস্ট ও এপিলেপ্টোলজিস্ট)
ডুমস্ক্রলিং বা রাতের ফোন ব্যবহারের অভ্যাস কমানোর সহজ উপায়
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার দরকার নেই। কেবল জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন ও নিয়ম মেনে চললেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব:
- ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে ডিভাইস বন্ধ: ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৬০ মিনিট আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।
- নির্দিষ্ট সময়ে খবর দেখা: সারাদিন বারবার খবরের আপডেট বা নিউজফিড না দেখে দিনে নির্দিষ্ট একটি সময় নির্ধারণ করুন।
- অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন অফ রাখা: বারবার ফোনের পপ-আপ নোটিফিকেশন যেন আপনার মনোযোগ নষ্ট না করতে পারে, সেজন্য অদরকারি অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
- শারীরিক চর্চা ও পারিবারিক সময়: মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা এবং প্রিয়জনদের সাথে সরাসরি সুন্দর সময় কাটানো অত্যন্ত জরুরি।
রাতে নিয়ম মেনে ফোন ব্যবহারের পরও যদি আপনার স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, চরম অনিদ্রা দেখা দেয় বা অতিরিক্ত উদ্বেগ দৈনন্দিন কাজকে প্রভাবিত করে, তবে বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।








