বছর পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের বয়স অনিবার্যভাবেই বাড়তে থাকে। জন্মনিবন্ধনের পাতায় যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন সংখ্যা। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি বয়সে পৌঁছালেই কি একজন মানুষ নিজেকে বৃদ্ধ মনে করেন? নাকি সমাজ বা চারপাশের মানুষ তাকে প্রবীণ হিসেবে দেখতে শুরু করলেই সে বৃদ্ধ হয়ে যায়?
আমাদের সমাজে বয়স বাড়া এবং প্রবীণ নাগরিক বা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হওয়ার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কৌতুহল উদ্দীপক। আধুনিক বিশ্বে মানুষের জীবনযাপন পরিবর্তন হওয়ার কারণে বার্ধক্য সম্পর্কে প্রচলিত পুরনো চিন্তাভাবনাগুলো এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একটি চার্চের ঘটনা এবং বার্ধক্যের অদ্ভুত বাস্তবতা
বার্ধক্য সম্পর্কে এক লেখকের একটি অভিজ্ঞতা বেশ অর্থবহ বিষয় ফুটিয়ে তোলে। জেবেল আলী নামের একটি গির্জায় বেদির কাছে দুই-তিনটি আসন প্রবীণ বা অসুস্থ উপাসনাকারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকত। আসনগুলো বেশির ভাগ সময় খালিই পড়ে থাকত।
লেখক এবং তার জীবনসঙ্গী বহু বছর ধরে সেই সংরক্ষিত আসনগুলো এড়িয়ে চলতেন। তাদের ধারণা ছিল, যাদের সত্যি সত্যিই এই আসনের প্রয়োজন, তাদের জন্যই এটি খালি রাখা উচিত। কিন্তু একদিন গির্জায় প্রচুর ভিড় থাকায় অন্য কোথাও বসার জায়গা না পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেন সেই সংরক্ষিত আসনেই বসবেন।
কিছুক্ষণ পর গির্জার এক আয়োজক এসে তাদের মনে করিয়ে দেন এই আসনগুলো প্রবীণ বা বয়স্ক নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত। লেখক তখন তাকে প্রশ্ন করেন, “কত বছর বয়স হলে কেউ প্রবীণ হয়? আমরা আসলে কখন বৃদ্ধ হয়ে যাই?”
এই ঘটনাটি বার্ধক্য সম্পর্কে সমাজ এবং মানুষের ভেতরের একটি বাস্তব রূপ তুলে ধরে। অনেকের কাছে বয়স বাড়াটা কঠিন বিষয় নয়, বরং অন্য কেউ তাকে ‘বৃদ্ধ’ বা ‘প্রবীণ’ হিসেবে দেখছে এবং ভাবছে এই বিষয়টি মেনে নেওয়াটাই সবচেয়ে বেশি কঠিন।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে বদলে যায় বার্ধক্যের সংজ্ঞা
বয়সের সাথে সাথে বয়স সম্পর্কিত আমাদের ধারণাও পরিবর্তন হতে থাকে। শিশুকাল বা শৈশবে ১০ বা ১২ বছরের একটি শিশুর কাছে ৫০ বছর বয়সী যেকোনো মানুষকে অনেক বেশি বৃদ্ধ মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ নিজে যখন ৫০ বছর বয়সে পা দেয়, তখন সে নিজেকে আশ্চর্যজনকভাবে তরুণ মনে করে। সে মনে করে জীবনের বহু সম্ভাবনাময় বছর এখনও তার সামনে বাকি রয়েছে।
এখানেই বয়স এবং বার্ধক্যের মধ্যে আসল পার্থক্যটি পরিষ্কার হয়:
- বয়স: এটি শুধুই একটি সংখ্যা যা প্রকাশ করে একজন মানুষ কত বছর ধরে এই পৃথিবীতে বেঁচে আছেন।
- বার্ধক্য: এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার একটি রূপ যা কেবল জন্মসনদের সংখ্যা দিয়ে মোপা যায় না।
জন্মসনদের সংখ্যা কখনো বলতে পারে না একজন মানুষ কতটা প্রাণবন্ত, তার কাজের সক্ষমতা কতটা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য তার মনের ভেতরে কী ধরনের স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।
প্রবীণদের আধুনিক জীবনযাত্রা: বদলে যাচ্ছে পুরানো ধারণা
বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র তার ‘As You Like It’ নাটকে মানুষের জীবনের শেষ পর্যায়কে ‘দ্বিতীয় শৈশব’ এবং ‘সবকিছু ভুলে যাওয়ার সময়’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে আজকের যুগে এসে শেক্সপিয়রের এই ধারণা অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
বর্তমান সময়ে প্রবীণ নাগরিকরা আর চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকেন না। তাদের আধুনিক জীবনযাত্রা দেখলে বার্ধক্যের পুরানো সংজ্ঞাকে সহজেই ভুল প্রমাণিত করা যায়:
- কর্মঠ ও সক্রিয় জীবন: বয়স্ক মানুষেরা এখন নিয়মিত চাকরি করছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং অফিসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
- ভ্রমণ ও রোমাঞ্চ: বয়সকে তোয়াক্কা না করে প্রবীণরা আন্তর্জাতিকভাবে নানা দেশ ভ্রমণ করছেন।
- খেলাধুলা ও শারীরিক কসরত: অনেকে নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন, ম্যারাথন দৌড় কিংবা দূরপাল্লার কঠিন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন।
- সামাজিক উন্নয়ন: বিভিন্ন ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকছেন।
স্বাস্থ্যসেবার দারুণ উন্নতি, আধুনিক জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রবীণরা এখন জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত বেশ সুস্থ ও প্রাণবন্ত জীবনযাপন করতে পারছেন।
প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবীণরা
আগে মনে করা হতো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রযুক্তির দৌড় এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আধুনিক বিশ্ব থেকে পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রযুক্তি এখন প্রবীণদের জীবনকে একদম বদলে দিয়েছে এবং তাদের তরুণদের মতোই সংযুক্ত রেখেছে।
স্মার্টফোন ব্যবহার, ভিডিও কলে স্বজনদের সাথে কথা বলা, অনলাইনে ব্যাংকিং লেনদেন করা কিংবা ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকা সবকিছুতেই এখন প্রবীণরা বেশ পারদর্শী। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা বয়সের পার্থক্য দূর করে প্রবীণদের আধুনিক পৃথিবীর সাথে সবসময় যুক্ত রাখছে।
বয়স শুধুই একটি সংখ্যা, ব্যক্তিত্বের পরিচয় নয়
বয়স বাড়ছে মানেই জীবনের আনন্দ, নতুন নতুন অভিজ্ঞতা বা ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হবে এমন ধারণার আর কোনো ভিত্তি নেই। তাই বার্ধক্য পরিমাপ করার জন্য কেবল কতগুলো বছর পার হলো তা গণনা করা বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়। বরং মানুষ সেই পার হয়ে যাওয়া বছরগুলো কীভাবে উপভোগ করে বেঁচে আছে, সেটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গির্জার সেই ঘটনার পর লেখক বুঝতে পেরেছিলেন যে, সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বসা কোনো লজ্জার বা এড়িয়ে চলার বিষয় নয়। জীবনের দীর্ঘ পথ অত্যন্ত সফলতা ও অভিজ্ঞতার সাথে পাড়ি দেওয়ার পর এই আসনে বসার যোগ্যতা অর্জন করাটা আসলে এক ধরণের বড় সাফল্য বা প্রাপ্তি।
সংক্ষেপে বলা যায়, আমরা কেবল তখনই বৃদ্ধ হই যখন আমরা মনে মনে নিজেদের বৃদ্ধ ভাবতে শুরু করি এবং নতুন কিছু শেখার আশা ছেড়ে দিই। যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরে শেখার আগ্রহ, নতুন কাজের উৎসাহ এবং জীবনকে উপভোগ করার ইচ্ছা থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত বয়স কেবল একটি সাধারণ সংখ্যা মাত্র। জীবনকে ভালোবাসুন, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করুন এবং বয়সকে কখনোই নিজের চলার পথের বাধা হতে দেবেন না।








