দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত ও সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে অনুষ্ঠিত ইস্তাম্বুলের চার দিনের বৈঠক ব্যর্থতায় শেষ হয়েছে।
তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনাটি হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আফগান প্রতিনিধিদলকে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেন, অন্যদিকে কাবুল পাল্টা অভিযোগ তোলে, পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল ছিল “অসংগঠিত” এবং “অস্পষ্ট অবস্থানসম্পন্ন।”
টিটিপি ইস্যুই মূল বাধা
আলোচনার মূল বিষয় ছিল তালেবান (টিটিপি), একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা পাকিস্তানের ভেতরে নিয়মিত হামলা চালায়।
ইসলামাবাদ কাবুলকে বারবার অনুরোধ করছে টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে, কিন্তু আফগান তালেবান তা করতে অনীহা প্রকাশ করছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেন, আফগান আলোচক দল আলোচনার মাঝপথে কাবুল থেকে পাওয়া নতুন নির্দেশে অবস্থান বদলে ফেলে, যা আলোচনাকে ব্যর্থ করে দেয়।
ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, এখন জটিল সম্পর্ক
এক সময় পাকিস্তানকে আফগান তালেবানের প্রধান সমর্থক হিসেবে দেখা হতো।
২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানের ক্ষমতায় ফেরায় ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু এরপরই সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়, বিশেষত টিটিপি ইস্যুতে।
আজ পাকিস্তান দাবি করছে, আফগানিস্তান শুধু টিটিপিকেই নয়, বরং বিএলএ ও আইএস-খোরাসান গোষ্ঠীকেও আশ্রয় দিচ্ছে, যা কাবুল দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করছে।
মতাদর্শগত বন্ধনই মূল সমস্যা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক বাকির সাজ্জাদ সৈয়দ মনে করেন, সমস্যার মূল শিকড় মতাদর্শে।
তাঁর ভাষায়,
“আফগান তালেবানরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য টিটিপির ওপর নির্ভরশীল। তাই পাকিস্তানের দাবি মেনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রায় অসম্ভব।”
অন্যদিকে বিশ্লেষক ইহসানউল্লাহ টিপু মেহসুদ বলেন, “তালেবান ও টিটিপি মতাদর্শগতভাবে ভাইয়ের মতো। তাই এই বিচ্ছেদ সম্ভব নয়।”
রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বাড়তে থাকা হতাহতের সংখ্যা
২০২৪ সাল পাকিস্তানের জন্য ছিল এক রক্তক্ষয়ী বছর, ২,৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
২০২৫ সালে সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে।
বিশেষত খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে টিটিপির কার্যক্রম ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এসিএলইডি (Armed Conflict Location and Event Data) অনুযায়ী, গত এক বছরে টিটিপি অন্তত ৬০০টি হামলা বা সংঘর্ষে যুক্ত ছিল, যা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
কূটনৈতিক পথেও ব্যর্থতা
কাতার, তুরস্ক ও চীনের মধ্যস্থতায় বহুবার বৈঠক হলেও কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন,
“প্রয়োজনে টিটিপির ঘাঁটিতে সীমান্ত অতিক্রম করে অভিযান চালানো হতে পারে।”
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পাকিস্তান হয়তো বুঝে গেছে, কূটনৈতিক পথে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ট্রাম্পের মন্তব্য
মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি “খুব দ্রুতই আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংকট মিটিয়ে ফেলবেন।”
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা এই মন্তব্যকে “রাজনৈতিক প্রচার” হিসেবেই দেখছেন।
তাঁদের মতে, সমঝোতার পথে প্রধান বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ।
যুদ্ধের সম্ভাবনা কতটা?
বেশিরভাগ বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন,
যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে সীমান্তে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের সম্ভাবনা প্রবল।
সাংবাদিক সামি ইউসুফজাই বলেন,
“যদি পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে অভিযান চালায়, তাহলে আফগান জনমত আরও পাকিস্তানবিরোধী হয়ে উঠবে, যা টিটিপির পক্ষে কাজ করবে।”
তিনি সতর্ক করেন, যদি তালেবান নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে “জিহাদের আহ্বান” জানান, তাহলে অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
অবিশ্বাসই সব সমস্যার মূলে
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে।
টিটিপি ইস্যু, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস এই তিন কারণেই দুই দেশ কোনো স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলবে, কিন্তু বাস্তবে শান্তি স্থাপনের পথ এখনও অনেক দূরে।








