অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন,
“সরকারের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও অনেক অনলাইন মিডিয়া পোর্টালে এখনও জুয়া ও অনিরাপদ কনটেন্টের বিজ্ঞাপন চলছে। তাই যেকোনো সময় সংশ্লিষ্ট পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়া হবে।”
তিনি এ মন্তব্য করেন মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবনে আয়োজিত
‘অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক এক সভায়।
যেসব পোর্টালের নাম উল্লেখ করা হয়েছে
সভায় ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব স্পষ্টভাবে কয়েকটি অনলাইন পোর্টালের নাম উল্লেখ করেন, যেগুলো এখনও অনিরাপদ বিজ্ঞাপন প্রচার করছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী,
“যুগান্তর, ভোরের কাগজ, ইনকিলাব, মানবকণ্ঠ, জাগো নিউজ, বাংলাদেশ ২৪ অনলাইন, আওয়ার নিউজ ২৪ সহ বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটে এখনও জুয়ার বিজ্ঞাপন ও অনিরাপদ কনটেন্ট দেখা যাচ্ছে।”
এই মন্তব্যের পর সাংবাদিক মহলে আলোচনার ঝড় ওঠে, কারণ এগুলো দেশের পরিচিত ও পুরোনো সংবাদমাধ্যম।
সরকারের নজরদারির নতুন পদ্ধতি
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, সরকার এখন ওয়েব ক্রলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও মোবাইল নম্বর শনাক্ত করছে।
তিনি বলেন,
“মে মাস থেকে এ পর্যন্ত ৪,৮২০টি এমএফএস (Mobile Financial Service) অ্যাকাউন্ট এবং ১,৩৩১টি ওয়েব পোর্টালের লিংক শনাক্ত করা হয়েছে।”
অর্থাৎ অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে যারা আর্থিক লেনদেন করছে, তাদের ডিজিটাল ট্র্যাক রেকর্ড ইতিমধ্যে সরকারের হাতে রয়েছে।
অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক কীভাবে কাজ করে
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার চক্র সাধারণত নিচের তিনটি ধাপে কাজ করে,
- ভুয়া বিজ্ঞাপন বা গেমিং লিংক প্রকাশ:
জনপ্রিয় নিউজ পোর্টাল বা ওয়েবসাইটে “খেলুন ও জিতুন” ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে দর্শকদের আকৃষ্ট করা হয়। - মোবাইল ফাইন্যান্স অ্যাকাউন্টে লেনদেন:
অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে বিকাশ, নগদ, রকেট বা অন্য মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। - নতুন সাইট খোলা:
পুরোনো লিংক বন্ধ হয়ে গেলে একই ধরনের নতুন ওয়েবসাইট খোলা হয়, ফলে চক্রটি সক্রিয় থাকে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন,
“নতুন নম্বর ও নতুন ওয়েবসাইট খুলে এই জুয়ার চক্র চলতে থাকে। তাই সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা
সভায় উপস্থিত ছিলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU)-এর প্রতিনিধিরা।
তাঁরা জানিয়ে দেন, এসব সাইটের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শনাক্ত হলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনিরাপদ কনটেন্টের ঝুঁকি
শুধু জুয়া নয়, অনেক ওয়েবসাইটে প্রাপ্তবয়স্ক বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার হচ্ছে, যা সামাজিকভাবে ক্ষতিকর।
এগুলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানসিক ও নৈতিক বিপর্যয় তৈরি করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড. রাকিব হোসেন বলেন,
“জুয়ার বিজ্ঞাপন বন্ধ করা শুধু ধর্মীয় বা নৈতিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বিদেশি সার্ভারভিত্তিক এসব সাইটে অর্থ পাচারের আশঙ্কা থাকে।”
মোবাইল অপারেটর ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
বিটিআরসি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, জুয়ার চক্রগুলো মোবাইলভিত্তিক লেনদেন সেবা (MFS) ব্যবহার করছে, বিশেষ করে বিকাশ, নগদ ও রকেট।
সেজন্য অপারেটরদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে তারা,
- সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্ট করে,
- এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ শনাক্তে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালু রাখে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের আহ্বান
সভায় ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জোর দিয়ে বলেন,
“আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক, ও সংবাদমাধ্যম, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকার একা এই জুয়ার চক্র থামাতে পারবে না।”
তিনি আরও জানান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওয়েবপোর্টাল ও এমএফএস নম্বরের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হবে।
অনলাইন পোর্টালগুলোর দায়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন,
অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে যাচাই-বাছাই না করায় এমন সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
রেভিনিউর লোভে অনেক পোর্টাল অজান্তেই অবৈধ বিজ্ঞাপন নিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য আইনি ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল অ্যাসোসিয়েশন (BONPA)-এর একজন প্রতিনিধি বলেন,
“আমরা সদস্যদের সতর্ক করছি যেন কোনোভাবেই জুয়া, বেটিং বা অনিরাপদ বিজ্ঞাপন না নেয়।”
প্রযুক্তিগত সমাধান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিটিআরসি ইতিমধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং সিস্টেম চালু করেছে, যা প্রতিদিন হাজার হাজার ওয়েব লিংক বিশ্লেষণ করছে।
এর মাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে ব্লক করা সম্ভব হবে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন,
“প্রযুক্তিগতভাবে দেশ এখন অনেক এগিয়েছে। আমরা চাই আইনসম্মত ও নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করতে।”
অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন শুধু নৈতিক নয়, এটি ডিজিটাল অপরাধ ও অর্থ পাচারের ঝুঁকিও তৈরি করছে।
সরকার এখন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে, তাই সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলোকে দ্রুত এসব বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যথায়, যেকোনো সময় তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।








