বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ এখন আর নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এক ভয়াবহ তথ্য সামনে এনেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টি জেলাতেই এখন নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই ভাইরাসের সংক্রমণের ধরণ এবং সময়কাল উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তন হচ্ছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) আইইডিসিআরের মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আগে মনে করা হতো এই ভাইরাস শুধু শীতকালেই ছড়ায়, কিন্তু এখন সারা বছরই এর ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ
আইইডিসিআরের তথ্যমতে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে যে চারটি নিপাহ ভাইরাসের কেস রেকর্ড করা হয়েছিল, তাদের প্রত্যেকেই মারা গেছেন। অর্থাৎ গত বছরে এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ছিল ১০০ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী যেখানে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তদের গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে এই হার চরম উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী এই চার জেলায় চারজন নিপাহ রোগী শনাক্ত হন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের কাউকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি বলে জানানো হয়েছে।
শীতকাল ছাড়াও ছড়াচ্ছে ভাইরাস: অ-মৌসুমি আতঙ্ক
সাধারণত আমরা জানি, শীতকালে খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। কিন্তু আইইডিসিআর এবার এক নতুন আশঙ্কার কথা শুনিয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো একটি ‘অ-মৌসুমি কেস’ বা ‘নন-সিজনাল কেস’ পাওয়া গেছে।
উপস্থাপিত প্রবন্ধে জানানো হয়, নওগাঁর ৮ বছরের একটি শিশু গত বছরের আগস্ট মাসে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আগস্ট মাস শীতকাল নয়, অর্থাৎ খেজুরের রস খাওয়ার মৌসুমও নয়। তাহলে শিশুটি কীভাবে আক্রান্ত হলো? গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুটি বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল (যেমন- কালোজাম, খেজুর বা আম) খেয়েছিল। এটি নিপাহ ছড়ানোর একটি নতুন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মানে হলো, এখন আর শুধু শীতে নয়, বছরের যেকোনো সময় অসাবধানতায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংক্রমণের ধরণ পরিবর্তন ও আইইডিসিআরের সতর্কতা
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি বড় ‘ওয়ার্নিং সিগন্যাল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “২০২৫ সালের অ-মৌসুমি কেস এবং সংক্রমণের নতুন পথ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা কতটা ঝুঁকির মুখে আছি। নিপাহ এখন আর শুধু শীতকাল বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সারা বছরের এবং বহুমুখী সংক্রমণের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।”
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঝুঁকি
নিপাহ ভাইরাস শুধু ফল বা রস থেকেই ছড়ায় না, এটি মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে। আইইডিসিআরের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে নিপাহ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সুস্থ ব্যক্তিরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এটি আক্রান্ত রোগীর পরিবারের সদস্য এবং হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই রোগীর সেবা করার সময় পিপিই (PPE) বা মাস্ক ও গ্লাভস পরা অত্যন্ত জরুরি।
নিরাপদ থাকতে আমাদের করণীয়
নিপাহ ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তাই সচেতনতাই বাঁচার একমাত্র উপায়। এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে আইইডিসিআর এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
১. খেজুরের কাঁচা রস বর্জন: খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। রস জ্বাল দিয়ে বা ফুটিয়ে খেলে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়।
২. পাখির খাওয়া ফল না খাওয়া: গাছ থেকে পাড়া যেকোনো ফল খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। কোনো ফলে যদি পাখির ঠোকর বা কামড়ের দাগ থাকে, তবে তা কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না।
৩. হাত ধোয়ার অভ্যাস: যেকোনো ফল বা খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
৪. রোগীর সংস্পর্শে সতর্কতা: নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত বা জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সেবা করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত কাপড় বা জিনিসপত্র সাবধানে পরিষ্কার করতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে বিশেষ নজরদারি
নিপাহ ভাইরাস জরিপ সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার জানান, ৩৫টি জেলায় ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নজরদারি বা সার্ভিলেন্স জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো রোগী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আসলে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালেও দেশে নিপাহ ভাইরাসে ৫ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাদের সবারই মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান এবং নতুন সংক্রমণের ধরণ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এখন প্রধান কাজ।








