জকসু নির্বাচন: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’। বহু প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস)-এর মতো শীর্ষ তিনটি পদেই বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে তারা। এর মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ভোটগ্রহণ শেষে বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত পৌনে ১২টার দিকে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় সংসদের ৩৮টি কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, অধিকাংশ পদেই আধিপত্য বিস্তার করেছে শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা।
শীর্ষ তিন পদের ভোটের পরিসংখ্যান
নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের মূল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভিপি এবং জিএস পদ। এই দুটি পদেই ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পরাজিত করেছেন শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা।
ভিপি পদে রিয়াজুল ইসলামের জয়
ভিপি পদে শিবির সমর্থিত প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম মোট ভোট পেয়েছেন ৫ হাজার ৫৬৪। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভিক জবিয়ান’ প্যানেলের প্রার্থী এ কে এম রাকিব পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৮৮ ভোট। অর্থাৎ, ৮৭৬ ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছেন রিয়াজুল ইসলাম।
জিএস পদে বিশাল ব্যবধান
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শিবিরের প্রার্থী আব্দুল আলিম আরিফ একপেশে জয় পেয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৫ হাজার ৪৭০ ভোট। তার বিপরীতে ছাত্রদলের প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ২ হাজার ২০৩ ভোট। ফলাফলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আব্দুল আলিম আরিফ তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ৩ হাজার ২৬৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।
এজিএস পদে মাসুদ রানার সাফল্য
সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদেও জয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছে অদম্য জবিয়ান ঐক্য। এই পদে মাসুদ রানা ৫ হাজার ২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের বিএম আতিকুর তানজিল পেয়েছেন ৩ হাজার ৯৪৪ ভোট। মাসুদ রানা ১ হাজার ৫৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
সম্পাদকীয় পদে অদম্য জবিয়ান ঐক্যের দাপট
শীর্ষ তিন পদের পাশাপাশি সম্পাদকীয় পদগুলোতেও শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা তাদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেছেন। মোট ৮টি সম্পাদকীয় পদে তারা বিজয়ী হয়েছেন। বিজয়ীরা হলেন:
- মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক: নুরনবী
- শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক: ইব্রাহিম খলিল
- স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক: নুর মোহাম্মদ
- সমাজসেবা ও শিক্ষার্থীকল্যাণ সম্পাদক: মোস্তাফিজুর রহমান
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক: সুখীমন খাতুন
- আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক: হাবিব মোহাম্মদ ফারুক আযম
- আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক: নওশীন নাওয়ার জয়া
- ক্রীড়া সম্পাদক: জর্জিস আনোয়ার নাঈম
ছাত্রদল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অর্জন
শীর্ষ পদগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও সম্পাদকীয় তিনটি পদে জয় পেয়েছে ছাত্রদল সমর্থিত ‘নির্ভীক জবিয়ান ঐক্য পরিষদ’। তাদের বিজয়ী প্রার্থীরা হলেন:
- পরিবহন সম্পাদক: মাহিদ হাসান
- পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক: রিয়াসাল রাকিব
- সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক: তাকরিম আহমেদ
অন্যদিকে, কার্যকরী সদস্য পদে মোট সাতটি পদের মধ্যে চারটিতেই জয় পেয়েছে শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রথম সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ফাতেমা আক্তার। এছাড়া মো. আকিব হাসাম, শান্তা আক্তার ও আব্দুল্লাহ আল ফারুক সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন।
বাকি তিন সদস্য পদের মধ্যে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকে সাদমান সাম্য ও ইমরান হাসান ইমন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মো. জাহিদ হাসান নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচন ও ভোটার উপস্থিতির চিত্র
দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা এবং কয়েক দফা তারিখ পরিবর্তনের পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো জকসু নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। মোট ১৬ হাজার ৪৪৫ জন ভোটারের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী।
নির্বাচনে মোট নারী ভোটারের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৪৭৯ জন এবং পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ১৭০ জন। নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট প্রার্থী ছিলেন ১৯০ জন। সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য ৩৯টি কেন্দ্রের ১৭৮টি বুথ স্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য ৩৮টি এবং হল সংসদের জন্য ১টি কেন্দ্র নির্ধারিত ছিল।
কোনো প্রকার সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। নবনির্বাচিত ভিপি রিয়াজুল ইসলাম জয়ের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানিয়ে ক্যাম্পাসের উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।








