দেশের ওষুধ শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ, একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা আর নেই। গত শুক্রবার (১৫ মে, ২০২৬) রাত ২টার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
পারিবারিক এবং কোম্পানি সূত্র থেকে তাঁর মৃত্যুর এই দুঃখজনক খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছিলেন। ব্যবসায়ী পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জন্ম ও বর্ণাঢ্য পারিবারিক পরিচয়
মিজানুর রহমান সিনহা ১৯৪৩ সালের ১৮ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কলমা ইউনিয়নের ডহুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হামিদুর রহমান সিনহা এবং মায়ের নাম নূরজাহান সিনহা। উল্লেখ্য, তার বাবা হামিদুর রহমান সিনহা ছিলেন বাংলাদেশের ওষুধ ব্যবসায়ের অন্যতম সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং বিখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী একমি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। মুন্সীগঞ্জে তাদের স্থানীয় বাড়ি ‘সিনহা হাউজ’ দীর্ঘদিন ধরে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
শিক্ষা ও চাকুরিজীবন থেকে সফল উদ্যোক্তা
মিজানুর রহমান সিনহার শৈশব কেটেছে কলকাতায়। পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় স্নাতক (গ্র্যাজুয়েশন) ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল ব্যাংকিং সেক্টর দিয়ে:
- ১৯৬৪ সাল: হাবিব ব্যাংকে চাকুরীর মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন।
- ১৯৭৫ সাল: পিতার মৃত্যুর পর ব্যাংকের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে পিতার প্রতিষ্ঠিত একমি গ্রুপে যোগ দেন।
- ১৯৮৩ সাল: একমি গ্রুপের হাল ধরেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) হিসেবে দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তার দক্ষ নেতৃত্বে একমি ল্যাবরেটরিজ দেশের অন্যতম শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিতে পরিণত হয় এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি থেকে বিএনপির নীতি নির্ধারক
মিজানুর রহমান সিনহা ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। সরকারি তোলারাম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (GS) নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপিতে যোগদান করেন। রাজনীতিতে তার সততা ও দক্ষতার কারণে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন এবং ২২ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে অবদান
মিজানুর রহমান সিনহা মুন্সীগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরপর দুবার সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
শোকের ছায়া রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে
তার এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের ব্যবসায়ী মহল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির পক্ষ থেকে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। তারা বলেছেন, মিজানুর রহমান সিনহার মৃত্যু দেশের শিল্প খাত এবং রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
পরিশেষে বলা যায়, মিজানুর রহমান সিনহা ছিলেন একাধারে একজন সফল ব্যাংকার, দূরদর্শী ব্যবসায়ী এবং জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। একমি ল্যাবরেটরিজকে দেশের মানুষের কাছে বিশ্বস্ত করে তোলার পেছনে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আনার পর নামাজে জানাজা ও দাফনের বিষয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে।








