হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeখোলা-জানালামাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি: এক ঐতিহ্য ও গৌরবময় অতীত
spot_img

মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি: এক ঐতিহ্য ও গৌরবময় অতীত

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রংপুরের আদি শহর মাহিগঞ্জ ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল কেন্দ্রবিন্দু, যার প্রধান কারিগর ছিলেন তাজহাটের জমিদার গোপাল চন্দ্র রায়।তিনি সমাজের সার্বিক উন্নতি এবং মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি, যা কেবল একটি পাঠাগার ছিল না, বরং ছিল জ্ঞান অন্বেষণের এক পবিত্র মন্দির।

এর ভিতরে সজ্জিত ছিল প্রায় দশ হাজারেরও বেশি মূল্যবান ও দুর্লভ সংগ্রহ, যা তখনকার সময়ে এক বিশাল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো।জ্ঞানপিপাসু মানুষের পদচারণায় প্রতিনিয়ত মুখরিত থাকতো এই প্রতিষ্ঠান, যা অতীতের এক অবিস্মরণীয় দলিল হয়ে আজও মানুষের মনে গেঁথে আছে।এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জমিদার গোপাল চন্দ্র রায় শুধু একটি ইট-কাঠের স্থাপনা নির্মাণ করেননি, বরং তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক জ্ঞানের আলো জ্বালানোর অঙ্গীকার করেছিলেন, যার উজ্জ্বলতা দীর্ঘদিন পুরো অঞ্চলকে আলোকিত করেছিল।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার বিচরণভূমি

মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি কেবল বই পড়ার স্থান হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।লাইব্রেরির বিশাল মাঠে সপ্তাহজুড়ে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক এবং যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো, যা স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।এসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন প্রতিষ্ঠাতা জমিদার গোপাল চন্দ্র রায় নিজেই, যা স্থানীয় শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এর খ্যাতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গেও ছড়িয়ে পড়েছিল, যার প্রমাণ মেলে সেখানকার অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে। বিশিষ্ট সাংবাদিক হাসেম আলীর সাক্ষ্যমতে, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, কথাসাহিত্যিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শেরে বাংলা এ কে এম ফজলুল হক এবং পল্লীগানের সম্রাট আব্বাস উদ্দিনসহ আরও অনেক গুণীজন এই লাইব্রেরি পরিদর্শনে এসেছিলেন এবং এর পরিবেশে মুগ্ধ হয়েছিলেন।তাদের পদচিহ্ন এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরির জন্য নিয়ে এলো এক কালো অধ্যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজসেবী আবদুল ওয়াহাবের বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই লাইব্রেরিকে তাদের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের টার্গেট বানায় এবং এটিকে তাদের দোসররাজাকারদের একটি ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।জ্ঞানের এই পবিত্র স্থানটিকে তারা অমানবিক কার্যকলাপের কেন্দ্রে পরিণত করে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল লাইব্রেরির অমূল্য বইগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে রান্নার কাজে ব্যবহার করা।

এই ঘটনা শুধু কিছু কাগজ পোড়ানো ছিল না, বরং ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব ও সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করার পাশবিক প্রয়াস।দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এর ক্ষতির মাত্রা কমেনি, বরং সম্ভবত সেই বিশৃঙ্খল সময়ে আরও কিছু ক্ষতি হয়েছিল, যা এই প্রতিষ্ঠানকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং তার সুন্দর অতীতকে ছিনিয়ে নেয়।

পরিত্যক্ত ভবন ও হারানো ঐতিহ্যের নীরবতা

স্বাধীনতার পর মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরিকে কয়েকবার চেষ্টা করা হয়েছিল তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনারজন্য, কিন্তু প্রতিবারই তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।একসময় এটি চালু করা হলেও অচিরেই তা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আবার চালুর প্রয়াস ব্যর্থ হয়।অবশেষে, ১৯৮২ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির সকল কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা ছিল এর ইতিহাসের এক দুঃখজনক মোড়।

প্রায় ১৪৪ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে এর কাঠামো।একদা পাঠক ও সাহিত্যিকদের সমাগমে মুখরিত থাকা এই স্থানটি আজ চারপাশে নীরবতা আর অবহেলার জঞ্জালে আবৃত। জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে এর দেয়াল আর ছাদ, যা দেখলে মনে হয় যেন সময়ের তীব্র গতিতে এটি নিজেকে ভুলে যেতে চাইছে, কিন্তু এর ইতিহাস এখনও স্থানীয়দের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।

পুনরুদ্ধারের আহ্বান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ধ্বংসের মুখে থাকা মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরিকে শুধু একটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দেওয়া উচিত নয়, বরং এর পুনরুদ্ধারের জন্য এখনই সময় এসেছে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার।সাংস্কৃতিককর্মী জাহাঙ্গীর আলম আঙ্গুরের মতো সচেতন নাগরিকরা ইতিমধ্যেই এর ভঙ্গুর ভবনটি ভেঙে সেখানে একটি আধুনিক ও কার্যকরী লাইব্রেরি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন।এই প্রস্তাবটি শুধু একটি স্থাপনা তৈরির কথা বলে না, বরং এটি একটি অঞ্চলের হারানো ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় বহন করে।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় ঘটিয়ে এই প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে এবং তাদের মধ্যে জ্ঞান অন্বেষণের নতুন এক আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলবে। এই লাইব্রেরির পুনর্জন্ম হলে তা শুধু একটি ভবন নির্মাণ হবে না, বরং হবে এক সমৃদ্ধ অতীতের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং আগামী দিনের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!