বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যায় হলো ২০১০ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তার ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ। দীর্ঘ ১৬ বছর পর সেই ঘটনার নেপথ্যের কারিগর ও পরিকল্পনাকারীদের নাম সামনে নিয়ে এসেছেন ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা অবস্থায় গোয়েন্দাদের কাছে তিনি এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন।
উচ্ছেদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও গোপন বৈঠক
শেখ মামুন খালেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর উচ্ছেদ অভিযানের ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ বাহিনীর সদর দপ্তরে এই চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। সেই বৈঠকে তৎকালীন প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই নির্ধারণ করা হয়, খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে কে কোন ভূমিকা পালন করবেন।
পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন যারা:
জিজ্ঞাসাবাদে শেখ মামুন খালেদ জানান, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সরাসরি তদারকি করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন:
- মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
- তৎকালীন ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর।
- সেনাবাহিনীর তৎকালীন উচ্চপদস্থ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।
মাঠ পর্যায়ের ভূমিকা ও ভিডিও ধারণ
উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল ডিজিএফআই’র একটি বিশেষ অংশ। তবে সাধারণ মানুষের চোখ এড়াতে মাঠ পর্যায়ে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ও র্যাবকে।
- সশরীরে উপস্থিতি: বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিত থেকে অভিযান পরিচালনা করেন।
- ভিডিও ধারণ: পুরো উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ভিডিও ধারণ করার জন্য ‘মু’ আদ্যাক্ষরের একজন মেজর পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া আইএসপিআর-এর তৎকালীন পরিচালকসহ ডিজিএফআই’র বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এক-এগারোর কুশীলব ও বর্তমান পরিস্থিতি
শেখ মামুন খালেদ এক-এগারো সরকারের সময় ডিজিএফআই’র কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে পদোন্নতি দিয়ে ডিজিএফআই’র মহাপরিচালক বানায়। বর্তমানে তিনি ছাড়াও এক-এগারোর আরেক বিতর্কিত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আফজাল নাছের এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী রিমান্ডে রয়েছেন।
| কর্মকর্তা | অভিযোগ ও বর্তমান অবস্থা |
| শেখ মামুন খালেদ | হত্যা মামলায় রিমান্ডে; খালেদা জিয়ার উচ্ছেদ নিয়ে তথ্য প্রদান। |
| আফজাল নাছের | তারেক রহমানকে নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ; রিমান্ডে। |
| মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী | মানব পাচার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির ১৩টি মামলা। |
৩৮ বছরের স্মৃতি ও এক কাপড়ে বিদায়
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে সরকার মঈনুল রোডের বাড়িটি বেগম খালেদা জিয়াকে লিজ দিয়েছিল। দীর্ঘ ৩৮ বছর সেখানে বসবাসের পর ২০১০ সালে তাকে স্বামী ও পরিবারের স্মৃতি বিজড়িত সেই বাড়ি থেকে প্রায় এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি তৎকালীন সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল এবং দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়েছিল।
খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের এই ঘটনাটি কেবল একটি উচ্ছেদ ছিল না, বরং এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বর্তমান রিমান্ডে থাকা সাবেক কর্মকর্তাদের জবানবন্দি সেই সময়ের অনেক গোপন সত্যকে সামনে নিয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিলে নতুন মাত্রা যোগ করবে।








