দেশের প্রান্তিক ও প্রকৃত কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়ন এবং কৃষি খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে এক বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বহুল প্রতিক্ষিত ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে গড়াচ্ছে। এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে কৃষক ও কৃষিজমির নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আজ থেকে। সরকারের এই মহতি উদ্যোগটি সরাসরি বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)।
শনিবার (১৮ জুলাই) থেকে দেশের সব উপজেলায় একযোগে এই বিশাল কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই তথ্য সংগ্রহ করা হবে, যা দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসবে।
প্রথম ধাপে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম: ব্লকে ব্লকে শুরু
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এত বড় একটি তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম যেন শতভাগ নির্ভুল হয়, সেজন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে।
- প্রাথমিক পদক্ষেপ: শুরুতেই একযোগে সব জায়গায় ঢালাওভাবে কাজ না করে, প্রাথমিকভাবে প্রতিটি উপজেলা থেকে একটি করে নির্দিষ্ট ‘ব্লক’ নির্বাচন করা হয়েছে।
- পর্যায়ক্রমিক সম্প্রসারণ: প্রথম ধাপে এই নির্বাচিত ব্লকগুলো থেকে কৃষকদের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পরবর্তীতে এই পরীক্ষামূলক (পাইলটিং) কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা ও সফলতার ওপর ভিত্তি করে উপজেলার অন্যান্য সব ব্লকেও পর্যায়ক্রমে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম স্বাক্ষরিত এক জরুরি অফিস আদেশে দেশের সকল মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্ত ও কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রস্তুতি
ডিএই (DAE) সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ে কৃষিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেটি ছিল ‘কৃষক কার্ড কারিগরি ওয়ার্কিং কমিটি’র দ্বিতীয় সভা। উক্ত সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ও রূপরেখা অনুযায়ী দেশব্যাপী একযোগে এই কৃষক ও জমির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই কার্যক্রমটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ‘তথ্য সংগ্রহ অ্যাপ’ তৈরি করা হয়েছে। এই অ্যাপটি যেন সবাই সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন, সেজন্য গত ১৪ জুলাই থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ করেই আজ ১৮ জুলাই থেকে মাঠপর্যায়ে সরাসরি কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করছেন মাঠকর্মীরা।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জারি করা অফিস আদেশে এই তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমকে ‘অত্যন্ত জরুরি’ এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিএই-এর সকল পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক, উপপরিচালক এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের নিজস্ব এলাকায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। একই সাথে নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত ও দক্ষতার সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন করার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে。
‘কৃষক কার্ড’ কেন কৃষকদের ভাগ্য বদলাবে?
সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রজেক্টটি সফল হলে দেশের কৃষকদের একটি সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ বা তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে। এর ফলে সরকারের প্রতিশ্রুত ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়ার পথ একদম সহজ হয়ে যাবে।
এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা যে সমস্ত অসাধারণ সুবিধা পাবেন:
১. প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণ: ভুয়া বা অকৃষকদের বাদ দিয়ে প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকদের সহজেই চেনা যাবে।
২. কৃষি প্রণোদনা ও ভর্তুকি: সরকারি সার, বীজ ও অন্যান্য প্রণোদনার টাকা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছাবে, ফলে মাঝখানে কোনো দুর্নীতি হবে না।
৩. সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কৃষকরা খুব সহজে এবং কম সুদে ঋণ নিতে পারবেন।
৪. দ্রুত সরকারি সেবা: কৃষি বিষয়ক যেকোনো সরকারি সেবা ও জরুরি পরামর্শ সরাসরি ডিজিটাল মাধ্যমে কৃষকের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।
সাধারণ পাঠকদের জন্য কিছু দরকারি তথ্য
আপনার এলাকায় যখন তথ্য সংগ্রহকারী কর্মকর্তারা আসবেন, তখন আপনার জমির সঠিক তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাথে রাখুন। তথ্য সঠিকভাবে দিলে আপনার নাম ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং আপনি ভবিষ্যতে সরকারের সকল কৃষি সুবিধার অংশীদার হতে পারবেন।
পরিশেষে বলা যায়, কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আজ থেকে এই খবরটি দেশের কোটি কোটি কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর মতো একটি সংবাদ। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। আশা করা যাচ্ছে, এই কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হলে দেশের কৃষি অর্থনীতি আরও মজবুত হবে এবং প্রকৃত কৃষকরা তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরে পাবেন।








