বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নামগুলোর একটি হলো জেফরি এপস্টেইন। মার্কিন এই ধনকুবেরের জীবন যেমন ছিল বিলাসবহুল, তার সমাপ্তি ঘটেছে ততটাই রহস্যময়ভাবে। ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের জেলখানায় তার মৃত্যুর পর মনে করা হয়েছিল রহস্যের ইতি ঘটেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে ‘এপস্টেইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাসের পর ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাক্ষরে গোপন নথিপত্র জনসমক্ষে আসতে শুরু করায় আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই অন্ধকার জগতের রাজা।
সাধারণ শিক্ষক থেকে বিলিওনেয়ার হওয়ার গল্প
নিউ ইয়র্কের এক সাধারণ পরিবারে বড় হওয়া এপস্টেইন সত্তর দশকে একটি বেসরকারি স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। তবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশচুম্বী। শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি নাম লেখান ওয়াল স্ট্রিটের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ে। নিজের মেধা আর বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে মাত্র চার বছরেই তিনি বাজিমাত করেন। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোং’। ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি দ্রুত আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ ধনকুবেরে পরিণত হন। নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে গড়ে তোলেন বিলাসবহুল প্রাসাদ।
ক্ষমতাধর বন্ধুদের আড্ডা ও অন্ধকার জগত
এপস্টেইনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সামাজিক যোগাযোগ। বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তার ওঠা-বসা ছিল নিয়মিত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প, সবাই ছিলেন তার বন্ধু তালিকায়। এমনকি ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সাথেও তার ছিল গভীর সখ্যতা।
তবে এই আভিজাত্যের আড়ালেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল যৌন চক্র। তার ব্যক্তিগত দ্বীপে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিনোদনের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের পাচার করা হতো বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালে এই বন্ধুত্বের জের ধরেই প্রিন্স অ্যান্ড্রু তার রাজকীয় উপাধি পর্যন্ত হারান।
আইনি লড়াই ও ‘শতাব্দীর সেরা সমঝোতা’
২০০৫ সালে প্রথম এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু নিজের প্রভাব খাটিয়ে ২০০৮ সালে তিনি এক বিতর্কিত ‘প্লি ডিল’ বা সমঝোতা করেন। ভয়াবহ সব অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি মাত্র ১৩ মাস কারাগারে কাটান এবং দিনের ১২ ঘণ্টা নিজের অফিসে কাজ করার সুযোগ পান। আইন বিশেষজ্ঞরা একে ‘শতাব্দীর সেরা ডিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ২০১৯ সালে আবারও মানবপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হন তিনি।
রহস্যময় মৃত্যু ও গিজলেন ম্যাক্সওয়েলের ভূমিকা
২০১৯ সালের ১০ আগস্ট জেলের ভেতরেই রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় এপস্টেইনের। যদিও একে আত্মহত্যা বলা হয়, তবে বিশ্বজুড়ে একে নিয়ে রয়েছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। তার মৃত্যুর পর সামনে আসে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিজলেন ম্যাক্সওয়েলের নাম। কিশোরীদের প্ররোচিত করার দায়ে ২০২১ সালে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে ম্যাক্সওয়েল স্বীকার করেন, এপস্টেইনের সাথে পরিচয় হওয়াটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
কেন আবার আলোচনায় এপস্টেইন ফাইল?
বর্তমানে মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশ করা হচ্ছে এপস্টেইন সংক্রান্ত হাজার হাজার পৃষ্ঠার গোপন নথি। এতে বেরিয়ে আসছে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম, যারা কোনো না কোনোভাবে এপস্টেইনের এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের সাথে যুক্ত ছিলেন। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, ফাইলগুলোতে আর কার কার মুখোশ উন্মোচিত হবে?
সূত্র: বিবিসি








