হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Saturday, August 15, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeইসলাম ও জীবনযাকাত হিসাব করার নিয়ম ও বিস্তারিত গাইডলাইন
spot_img

যাকাত হিসাব করার নিয়ম ও বিস্তারিত গাইডলাইন

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। ঈমানের পর সালাত বা নামাজের পরেই কুরআনে সবচেয়ে বেশি যে ইবাদতের কথা বলা হয়েছে, তা হলো যাকাত। এটি কোনো ঐচ্ছিক দান বা খয়রাত নয়, বরং ধনী বা সামর্থ্যবান মুসলিমদের সম্পদের ওপর আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত গরিবের হক।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে যাকাত অসামান্য ভূমিকা পালন করে। এটি সম্পদকে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হতে দেয় না, বরং সমাজে অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করে। একজন মুসলিম হিসেবে যাকাত হিসাব করার নিয়ম জানা এবং সঠিক সময়ে তা আদায় করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।

আজকের এই বিস্তারিত গাইডে আমরা আলোচনা করব কীভাবে স্বর্ণ, রুপা, নগদ অর্থ এবং ব্যবসার মালের যাকাত হিসাব করবেন। ২০২৬ সালে যাকাতের নিসাব কত এবং কাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে, তার সবকিছুই থাকছে এই আর্টিকেলে।

যাকাত কী এবং কেন ফরজ?

যাকাত (Zakat) শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘পবিত্রতা’, ‘বৃদ্ধি পাওয়া’ বা ‘বরকত’। পারিভাষিক অর্থে, আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে, বছর শেষে সেই সম্পদের নির্দিষ্ট একটি অংশ (২.৫%) নির্দিষ্ট খাতসমূহে দান করাকে যাকাত বলা হয়।

কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো।” (সূরা বাকারা: ৪৩)

এই যাকাত দিলে সম্পদ কমে না, বরং বাড়ে এবং পবিত্র হয়। এটি মানুষের মন থেকে কৃপণতা দূর করে এবং সম্পদের প্রতি অত্যধিক মোহ কমিয়ে দেয়। পরকালে কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে এবং ইহকালে সম্পদের বরকত লাভের জন্য যাকাত আদায় করা ফরজ।

যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ

যাকাত দিলেই হবে না, বরং কার ওপর যাকাত ফরজ এবং কখন ফরজ হয়, তা জানা জরুরি। প্রতিটি মুসলিমের ওপর ঢালাওভাবে যাকাত ফরজ নয়। যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য ৭টি মূল শর্ত পূরণ করতে হয়:

মুসলিম ও স্বাধীন হওয়া

যাকাত ফরজ হওয়ার প্রথম শর্ত হলো ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। অমুসলিমদের ওপর যাকাত ফরজ নয়। এছাড়া ব্যক্তিকে স্বাধীন হতে হবে, দাস-দাসীর ওপর যাকাত ফরজ নয়।

নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া

শরীয়ত নির্ধারিত ন্যূনতম যে পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে যাকাত ফরজ হয়, তাকে ‘নিসাব’ বলে। কারো কাছে যদি নিসাব পরিমাণের চেয়ে কম সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে না।

সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হওয়া (হাওলানুল হাওল)

শুধুমাত্র নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই সাথে সাথে যাকাত দিতে হয় না। ওই সম্পদটি মালিকের হাতে পূর্ণ এক চন্দ্র বছর (Lunar Year) বা ৩৫৪ দিন স্থায়ী হতে হবে। এই সময়কালকে ইসলামি পরিভাষায় ‘হাওলানুল হাওল’ বলা হয়। তবে বছরের মাঝে সম্পদ কম-বেশি হতে পারে, দেখার বিষয় হলো বছরের শুরুতে এবং শেষে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে কি না।

ঋণ মুক্ত থাকা

ব্যক্তি যদি এমন ঋণগ্রস্ত হন যে, ঋণ পরিশোধ করলে তার কাছে আর নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে না, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ নয়। অর্থাৎ, মোট সম্পদ থেকে ঋণ বাদ দেওয়ার পর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবেই যাকাত দিতে হবে।

সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া

যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদটি বর্ধনশীল (Productive) হতে হবে। যেমন: ব্যবসা, গবাদি পশু, নগদ টাকা, স্বর্ণ-রৌপ্য ইত্যাদি। নিজের বসবাসের বাড়ি, ব্যবহারের গাড়ি বা আসবাবপত্রের ওপর যাকাত আসে না, কারণ এগুলো বর্ধনশীল সম্পদ নয়।

যাকাতের নিসাব: স্বর্ণ ও রুপার হিসাব

যাকাত গণনার মূল ভিত্তি হলো নিসাব। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী নিসাবের মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু পরিমাপটি নির্দিষ্ট। নিচে একটি ছকের মাধ্যমে বিষয়টি সহজ করা হলো:

সম্পদের ধরণনিসাবের পরিমাণ (তোলা/ভরি)নিসাবের পরিমাণ (গ্রাম)
স্বর্ণ (Gold)সাড়ে ৭ তোলা (৭.৫ ভরি)৮৫ গ্রাম (প্রায়)
রুপা (Silver)সাড়ে ৫২ তোলা (৫২.৫ ভরি)৫৯৫ গ্রাম (প্রায়)

স্বর্ণের যাকাতের নিসাব

কারো কাছে যদি শুধুই স্বর্ণ থাকে এবং তা সাড়ে ৭ ভরি (৮৫ গ্রাম) বা তার বেশি হয়, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ। এর কম হলে যাকাত দিতে হবে না। স্বর্ণের যাকাত বের করার সময় ওই দিনের বাজার দর অনুযায়ী স্বর্ণের বিক্রয় মূল্য (Selling Price) হিসাব করতে হবে।

রুপার যাকাতের নিসাব

কারো কাছে যদি শুধুই রুপা থাকে এবং তা সাড়ে ৫২ ভরি (৫৯৫ গ্রাম) বা তার বেশি হয়, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ।

টাকা বা ক্যাশ অর্থের নিসাব

এখন প্রশ্ন হলো, নগদ টাকার নিসাব কীভাবে ধরবেন? স্বর্ণ নাকি রুপা?

ইসলামি স্কলারদের মতে, নগদ টাকার ক্ষেত্রে রুপার নিসাবকে (৫৯৫ গ্রাম রুপার দাম) স্ট্যান্ডার্ড ধরা উত্তম এবং সতর্কতামূলক। কারণ রুপার দাম স্বর্ণের চেয়ে কম। ফলে কম টাকার মালিক হলেও তিনি যাকাতের আওতায় পড়বেন এবং এতে গরিবদের উপকার বেশি হয়।

উদাহরণ: বর্তমানে ৫৯৫ গ্রাম রুপার দাম যদি ১ লাখ টাকা হয়, তবে আপনার কাছে ১ লাখ টাকা জমা থাকলেই যাকাত ফরজ হবে।

বিভিন্ন ধরণের সম্পদের যাকাত নির্ণয় পদ্ধতি

মানুষের সম্পদ এখন আর শুধু স্বর্ণ বা রুপায় সীমাবদ্ধ নেই। শেয়ার মার্কেট, বন্ড, ডিপিএসসহ নানা খাতে মানুষ বিনিয়োগ করে। আসুন জেনে নিই এগুলোর যাকাত হিসাব করার নিয়ম।

ব্যবহার্য ও অব্যবহৃত স্বর্ণালংকারের যাকাত

স্বর্ণ বা রুপার গহনা ব্যবহার করা হোক বা সিন্ধুকে পড়ে থাকুক উভয় ক্ষেত্রেই যাকাত দিতে হবে (হানাফি মাযহাব মতে)। নারীদের ব্যবহৃত গহনার পরিমাণ যদি নিসাব (সাড়ে ৭ ভরি) অতিক্রম করে, তবে তার বর্তমান বাজার মূল্য হিসাব করে ২.৫% যাকাত দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গহনায় খাদ থাকে। যাকাত হিসাব করার সময় গহনার মূল স্বর্ণের ওজন বা ক্যারেট অনুযায়ী দাম ধরতে হবে, মজুরি বা পাথরের দাম বাদ দিয়ে।

হাতে গচ্ছিত নগদ ও ব্যাংকের টাকার যাকাত

আপনার হাতে থাকা নগদ টাকা, ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্ট (Savings Account) বা কারেন্ট অ্যাকাউন্টে (Current Account) জমানো টাকা সব মিলিয়ে হিসাব করতে হবে। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর ব্যালেন্স যা থাকবে, তার ওপর যাকাত আসবে।

ডিপিএস (DPS), এফডিআর (FDR) ও বন্ডের যাকাত

ফিক্সড ডিপোজিট বা ডিপিএস-এর ক্ষেত্রে যাকাত হিসাব করার নিয়ম হলো:

১. মূল জমা টাকা (Principal Amount)-এর ওপর যাকাত দিতে হবে।

২. ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত মুনাফা বা সুদ (Interest) ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এই সুদের টাকার ওপর যাকাত হয় না, বরং সুদের পুরো টাকাটাই সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিবদের দান করে দিতে হবে।

সুতরাং, শুধুমাত্র আপনার জমানো মূল টাকার ওপর ২.৫% হারে যাকাত দিবেন।

ব্যবসার পণ্যের যাকাত হিসাব করার নিয়ম

ব্যবসায়ীদের জন্য যাকাত হিসাব করা অত্যন্ত জরুরি। আপনার দোকান, শোরুম বা গোডাউনে যে পণ্যগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা আছে, সেগুলোর বর্তমান বাজার মূল্য (Current Market Value) বা বিক্রয়মূল্য হিসাব করতে হবে।

  • দোকানের ডেকোরেশন, আসবাবপত্র বা ব্যবহারের গাড়ির ওপর যাকাত আসবে না।
  • কাঁচামাল বা তৈরি পণ্য সবকিছুর মূল্য হিসাব করে মোট সম্পদের সাথে যোগ করতে হবে।

শেয়ার বাজারের বিনিয়োগের যাকাত

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ দুই ধরণের হতে পারে:

১. ডিভিডেন্ড খাওয়ার উদ্দেশ্যে: এক্ষেত্রে কোম্পানির কেনা স্থায়ী সম্পদের ওপর যাকাত আসে না, তবে লিকুইড অ্যাসেট বা লাভ হিসেবে পাওয়া টাকার ওপর যাকাত দিতে হবে।

২. ক্যাপিটাল গেইন বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে (Buy & Sell): যদি শেয়ার কেনা হয় দাম বাড়লে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে, তবে ওই শেয়ারের বর্তমান বাজার মূল্য (Market Value) হিসাব করে পুরোটার ওপর যাকাত দিতে হবে।

প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির যাকাত

সরকারি বা বেসরকারি চাকরির প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি হাতে না পাচ্ছেন, ততক্ষণ তার যাকাত দিতে হবে না। যখন টাকাটি আপনার অ্যাকাউন্টে জমা হবে বা আপনি হাতে পাবেন, তখন থেকে সেটি আপনার সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে এবং অন্যান্য সম্পদের সাথে যোগ করে যাকাত দিতে হবে। তবে চাইলে আগাম যাকাত দেওয়াও জায়েজ।

জমির ফসল ও গবাদি পশুর যাকাত

শহুরে সম্পদের বাইরে কৃষিভিত্তিক সম্পদের ওপরও যাকাত বা ওশর প্রযোজ্য।

ওশর বা ফসলের যাকাত

জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের যাকাতকে ‘ওশর’ বলা হয়।

  • বিনা সেচে ফসল: বৃষ্টির পানিতে বা প্রাকৃতিকভাবে যদি ফসল হয়, তবে মোট ফসলের ১০% (দশ ভাগের এক ভাগ) যাকাত দিতে হবে।
  • সেচ দেওয়া ফসল: যদি নিজের টাকা খরচ করে সেচ বা কৃত্রিম উপায়ে পানি দিয়ে ফসল ফলানো হয়, তবে মোট ফসলের ৫% (বিশ ভাগের এক ভাগ) যাকাত দিতে হবে।
  • ফসলের ক্ষেত্রে এক বছর পার হওয়া শর্ত নয়, ফসল ঘরে তোলার সময়ই ওশর দিতে হয়।

গরু, ছাগল ও উটের যাকাত

গবাদি পশু যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে পালন করা হয় (যেমন ডেইরি ফার্ম বা মোটাতাজাকরণ), তবে সেগুলোকে ‘ব্যবসায়িক পণ্য’ ধরে গরুর বাজার মূল্য হিসাব করে ২.৫% যাকাত দিতে হবে। আর যদি মাঠে চরে বেড়ানো (সাঈমা) পশু হয় এবং দুধ/বাচ্চা নেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন ৩০টি গরু, ৪০টি ছাগল) পূর্ণ হলে পশু দিয়েই যাকাত দিতে হয়। এর বিস্তারিত চার্ট আলাদাভাবে জেনে নেওয়া উত্তম।

মোট সম্পদ থেকে ঋণ বা দায় বাদ দেওয়া

যাকাতযোগ্য সম্পদ (Assets) থেকে দায় (Liabilities) বাদ দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আপনার মোট সম্পদ থেকে নিচের বিষয়গুলো বাদ যাবে:

১. পারিবারিক খরচ: পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ।

২. তাৎক্ষণিক পরিশোধযোগ্য ঋণ: যে ঋণ এখনই বা খুব শীঘ্রই পরিশোধ করতে হবে।

৩. বাকিতে কেনা পণ্যের মূল্য: ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে পাওনাদারের টাকা।

দীর্ঘমেয়াদী ঋণ (যেমন হাউজ লোন): আধুনিক স্কলারদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী ঋণের পুরোটা বাদ দেওয়া যাবে না। শুধুমাত্র আগামী এক বছরে যে কিস্তি (Installment) পরিশোধ করতে হবে, সেই পরিমাণ টাকা মোট সম্পদ থেকে বাদ দেওয়া যাবে।

যাকাত ক্যালকুলেটর: ধাপে ধাপে হিসাব উদাহরণসহ

বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমরা জনাব রহিমের একটি কাল্পনিক হিসাব দেখব।

জনাব রহিমের সম্পদের বিবরণ:

  • স্বর্ণালংকার: ২ ভরি (ধরি ১ ভরি = ১,০০,০০০ টাকা) = ২,০০,০০০ টাকা।
  • ব্যাংকে জমানো টাকা: ১,০০,০০০ টাকা।
  • দোকানের মালের মূল্য: ২,০০,০০০ টাকা।
  • বন্ধুর কাছে পাওনা ঋণ: ৫০,০০০ টাকা (যা ফেরত পাওয়ার আশা আছে)।
  • মোট ঋণ (ব্যাংক লোন): ১,০০,০০০ টাকা।

হিসাব:

বিবরণটাকার পরিমাণ
১. স্বর্ণের মূল্য২,০০,০০০ টাকা
২. ব্যাংকের টাকা১,০০,০০০ টাকা
৩. ব্যবসার মাল২,০০,০০০ টাকা
৪. পাওনা টাকা৫০,০০০ টাকা
মোট যাকাতযোগ্য সম্পদ৫,৫০,০০০ টাকা
(বিয়োগ) মোট ঋণ(১,০০,০০০ টাকা)
নিট বা প্রকৃত সম্পদ৪,৫০,০০০ টাকা

যাকাতের পরিমাণ: ৪,৫০,০০০ টাকার ২.৫% = ১১,২৫০ টাকা।

জনাব রহিমকে ১১,২৫০ টাকা যাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে।

যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ (কাদের যাকাত দেওয়া যাবে?)

পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবাহর ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত ৮টি খাতের কথা উল্লেখ করেছেন। এই খাতগুলোর বাইরে যাকাত দিলে তা আদায় হবে না।

১. ফকির (দরিদ্র): যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই।

২. মিসকিন (নিঃস্ব): যার কিছুই নেই, অন্যের কাছে হাত পাতে।

৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী: ইসলামী রাষ্ট্রে যারা যাকাত উত্তোলনের কাজ করেন।

৪. মন জয় করার জন্য (মুয়াল্লাফাতুল কুলুব): নওমুসলিমদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে বা তাদের সাহায্যার্থে।

৫. দাস মুক্তির জন্য: বর্তমানে এই খাতটি প্রচলিত নেই।

৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যিনি ঋণভারে জর্জরিত এবং ঋণ শোধ করার সামর্থ্য নেই।

৭. আল্লাহর পথে জিহাদকারী (ফি সাবিলিল্লাহ): যারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত।

৮. মুসাফির বা অসহায় পথিক: যিনি সফরে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন (বাড়িতে ধনী হলেও)।

যাদের যাকাত দেওয়া যাবে না

চাইলেই আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দেওয়া যায় না। যাদের যাকাত দেওয়া নিষিদ্ধ:

  • নিজের বাবা-মা, দাদা-দাদি (ঊর্ধ্বতন পুরুষ/নারী)।
  • নিজের সন্তান, নাতি-নাতনি (অধস্তন পুরুষ/নারী)।
  • স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে।
  • সচ্ছল বা ধনী ব্যক্তি।
  • অমুসলিম ব্যক্তি।
  • মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ বা রাস্তাঘাট মেরামতে যাকাতের টাকা দেওয়া যায় না (মালিকানা স্বত্ব বুঝিয়ে দেওয়া শর্ত)।

যাকাত কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, এটি আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। যাকাত হিসাব করার নিয়ম জানা এবং সঠিকভাবে তা পালন করা আমাদের সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আপনার সম্পদের সামান্য একটি অংশ (শতকরা আড়াই টাকা) একজন অসহায় মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

আসুন, আমরা আমাদের সম্পদের সঠিক হিসাব করি এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যাকাত আদায় করি। হিসাব নিয়ে কোনো জটিলতা মনে হলে স্থানীয় বিজ্ঞ আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তৌফিক দিন এবং যাকাত প্রদানের মাধ্যমে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ দান করুন। আমিন।

যাকাত হিসাব করার সহজ নিয়ম সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন: যাকাতের হার কত?

উত্তর: যাকাতের হার হলো মোট উদ্বৃত্ত সম্পদের ২.৫% বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় ২.৫০ টাকা।

প্রশ্ন: আমার একটি ফ্ল্যাট আছে যা ভাড়া দিয়েছি, এর কি যাকাত দিতে হবে?

উত্তর: না, ভাড়ার জন্য কেনা ফ্ল্যাট, বাড়ি বা গাড়ির মূল্যের ওপর যাকাত আসে না। তবে ভাড়া থেকে যে আয় (Income) আসে, তা যদি এক বছর আপনার কাছে জমা থাকে এবং নিসাব পরিমাণ হয়, তবে সেই টাকার যাকাত দিতে হবে।

প্রশ্ন: স্ত্রীর গহনার যাকাত কে দিবে? স্বামী নাকি স্ত্রী?

উত্তর: গহনার মালিক মূলত স্ত্রী, তাই যাকাত আদায়ের দায়িত্ব স্ত্রীর ওপরই বর্তায়। স্ত্রী যদি রোজগার না করেন বা তার সামর্থ্য না থাকে, তবে তিনি গহনা বিক্রি করে যাকাত দিবেন। তবে স্বামী যদি ভালোবেসে স্ত্রীর পক্ষ থেকে যাকাত দিয়ে দেন, তবে তা আদায় হয়ে যাবে এবং স্বামী সওয়াব পাবেন।

প্রশ্ন: আমি কি সরকারকে দেওয়া ট্যাক্সকে যাকাত হিসেবে ধরতে পারি?

উত্তর: না। ট্যাক্স বা আয়কর হলো রাষ্ট্রীয় আইন মান্য করার খরচ, আর যাকাত হলো আল্লাহর ইবাদত।

প্রশ্ন: ডায়মন্ড বা হীরার গহনার কি যাকাত আছে?

উত্তর: যদি ডায়মন্ড বা মূল্যবান পাথর ব্যবসার উদ্দেশ্যে কেনা হয়, তবে তার যাকাত দিতে হবে। আর যদি নিজের ব্যবহারের জন্য কেনা হয়, তবে হীরা বা পাথরের ওপর যাকাত ফরজ নয়। শুধুমাত্র সোনা ও রুপার ওপরই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যাকাত ফরজ।

প্রশ্ন: রমজান মাসে যাকাত দেওয়া কি জরুরি?

উত্তর: রমজান মাসে যাকাত দেওয়া জরুরি নয়, তবে উত্তম। কারণ রমজানে যেকোনো ইবাদতের সওয়াব ৭০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

প্রশ্ন: হারাম ইনকাম বা সুদের টাকার কি যাকাত হয়?

উত্তর: না, হারাম টাকার কোনো যাকাত নেই। হারাম বা অবৈধভাবে উপার্জিত পুরো টাকাটাই সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করে দিতে হবে।

প্রশ্ন: নিজের ভাই-বোনকে কি যাকাত দেওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, যাবে। যদি আপন ভাই-বোন গরিব বা যাকাতের হকদার হয়, তবে তাদের যাকাত দেওয়া উত্তম।

প্রশ্ন: অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য কি হাসপাতালের বিল হিসেবে যাকাত দেওয়া যাবে?

উত্তর: সরাসরি হাসপাতালকে দিলে হবে না। তবে যদি কোনো গরিব রোগীকে ওষুধের টাকা বা ক্যাশ টাকা দেওয়া হয় এবং সে তা দিয়ে বিল শোধ করে, তবে জায়েজ হবে। এখানে ‘তামলিক’ বা মালিক বানিয়ে দেওয়া শর্ত।

প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কি যাকাত দেওয়া লাগে?

উত্তর: কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ওপর বকেয়া যাকাত মাফ হয়ে যায় না। ওয়ারিশদের উচিত মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে আগে তার বকেয়া যাকাত আদায় করা এবং তারপর বাকি সম্পত্তি বণ্টন করা।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!