ইসরায়েলে এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে নির্যাতনের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনীর সাবেক এক নারী প্রসিকিউটরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ইসরায়েলের রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও গণমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত ওই সাবেক প্রসিকিউটরের নাম ইয়াফাত তোমের-ইয়েরুশালমি, যিনি সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
গ্রেপ্তারের পেছনের ঘটনা
ইসরায়েলি পুলিশের বরাত দিয়ে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী জানিয়েছেন, ইয়াফাত তোমের-ইয়েরুশালমিকে সোমবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, তাঁর মাধ্যমেই ফিলিস্তিনি বন্দী নির্যাতনের ভিডিওটি অনলাইনে ফাঁস হয়েছিল।
ভিডিওটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনার মুখে পড়ে ইসরায়েল। ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু ইসরায়েলি সৈন্য এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে আলাদা স্থানে নিয়ে গিয়ে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সঙ্গে একটি প্রশিক্ষিত কুকুরও রয়েছে। সৈন্যরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার করে নিজেদের কার্যকলাপ আড়াল করলেও ভিডিও ফুটেজে নির্যাতনের ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল।
ভিডিও ফাঁসের পর পদত্যাগ ও নিখোঁজ
ভিডিওটি ফাঁসের পর ইয়াফাত তোমের-ইয়েরুশালমি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। জনমতের চাপের মুখে তিনি সেনাবাহিনীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি নিখোঁজ ছিলেন কয়েক দিন। পরে সোমবার রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী বলেন,
“এই ভিডিওটি আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েলের জনসংযোগ ও ভাবমূর্তির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত।”
রাজনৈতিক ঝড় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলে এক রাজনৈতিক ও আইনি ঝড় বইছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, সরকার এবং সেনাবাহিনী এখন এক ধরনের ‘দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায়’ আছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক নউর ওদেহ জানান,
“ইয়াফাত তোমের-ইয়েরুশালমির গ্রেপ্তারের খবর ইসরায়েলে রাজনৈতিক ও আইনি ঝড় তৈরি করেছে। তবে এই গ্রেপ্তার নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ মূল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাটি থেকে জনগণের নজর সরিয়ে দিচ্ছে।”
ভিডিও ফাঁসের পেছনে মানবাধিকার প্রশ্ন
ভিডিও ফাঁসের পর ইসরায়েলি সেনাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই ভিডিও কেবল একটি ঘটনা নয় বরং ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নিয়মিত নির্যাতনের প্রতিফলন।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের কারাগারে অন্তত ৭৫ জন ফিলিস্তিনি বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই শারীরিক নির্যাতন, চিকিৎসার অভাব বা অনাহারের কারণে মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলি সরকারের অবস্থান
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন,
“এই ভিডিও ফাঁস রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করেছে। সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগকে এখন আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
সরকারি সূত্র বলছে, ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় জড়িত সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে, এটি কেবল জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের একটি পদক্ষেপ।
ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিক্রিয়া
অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাঁদের দাবি,
“এমন নির্যাতন নতুন নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা।”
গাজার এক বন্দী পরিবারের সদস্য জানান,
“আমাদের সন্তানদের অমানবিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। ভিডিওটি কেবল এক ঝলক, বাস্তবে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে।”
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে। তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, কতটা নিরপেক্ষভাবে এই অভিযোগগুলো তদন্তে সহায়তা করবে?
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরায়েলি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ না বাড়লে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এই ঘটনায় জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাংশ বলছে, ইয়াফাত তোমের-ইয়েরুশালমি একজন দেশদ্রোহী, কারণ তিনি সেনাবাহিনীর গোপন তথ্য প্রকাশ করেছেন। অন্যরা বলছে, তিনি “সত্য উন্মোচনের সাহসী কণ্ঠস্বর।”
ইসরায়েলের কিছু সংবাদপত্রে তাঁকে “whistleblower” হিসেবে প্রশংসাও করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি বন্দীদের বাস্তবতা
ইসরায়েলের কারাগারে বর্তমানে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি বন্দী রয়েছে। অনেকেই কোনো বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর আটক আছেন। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ফিলিস্তিনি বন্দীদের অনেকেই অমানবিক পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন, যেখানে শারীরিক নির্যাতন, ঘুম বঞ্চনা এবং চিকিৎসার অভাব নিয়মিত ঘটনা।
ইয়াফাত তোমের-ইয়েরুশালমির গ্রেপ্তার ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর নৈতিকতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও এটি বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে, ফিলিস্তিনি বন্দীদের জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার বিচার না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।








