ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলেও ইসরাইলি হামলা থামছে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ১৬৯ জনে। এই তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও গত এক মাসে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় নতুন করে অন্তত ২৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি।
ইসরাইলি সেনাদের অজুহাত ও ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু
শনিবারের সর্বশেষ হামলায় আরও দুই ফিলিস্তিনির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, ইসরাইলি সেনারা যুদ্ধবিরতির শর্ত উপেক্ষা করে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। গাজার উত্তর সীমান্তে ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রম করার অভিযোগ তুলে তারা গুলি করে হত্যা করছে নিরীহ মানুষকে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই ‘ইয়েলো লাইন’ আসলে এক অদৃশ্য সীমা, যা কোথায় রয়েছে তা কেউ জানে না। ফলে প্রতিদিনই অনেকে অজান্তেই ওই এলাকায় প্রবেশ করে প্রাণ হারাচ্ছেন। শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউই বাদ যাচ্ছে না ইসরাইলি আগ্রাসনের হাত থেকে।
বোমা, ধ্বংস আর দূষিত পানির সংকট
গাজার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল প্রায় দুই লাখ টন বোমা ফেলেছে উপত্যকায়। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার টন বোমা এখনো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে, যা বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
হামলায় ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি সরবরাহ স্টেশন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শেখ রাদওয়ান এলাকা, যেখানে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ দূষিত পানির সংকট। বৃষ্টির পানি জমে থাকা পুকুরগুলোতে এখন ময়লা-আবর্জনা ভাসছে।
ইসরাইলি হামলায় পাম্প স্টেশন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়, সেই দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বসতি ও আশ্রয়শিবিরে। পানির স্তর বেড়ে গেছে প্রায় ৬ মিটার পর্যন্ত, যা এখন দুর্গন্ধ, মশা এবং সংক্রমণের বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ভূগর্ভস্থ পানির বেশিরভাগ অংশই এখন মারাত্মকভাবে দূষিত, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি।
মানবিক বিপর্যয় ও শিশুদের দুর্দশা
গাজার হাসপাতালগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত ওষুধ, চিকিৎসক ও সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক জায়গায় অপারেশন বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার আহত মানুষ চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ জানিয়েছে, গাজায় প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই এখন মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত। তারা পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে না।
পশ্চিম তীরে বাড়ছে সহিংসতা
শুধু গাজাই নয়, পশ্চিম তীরেও সহিংসতা বেড়ে চলেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেনিনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাবা গ্রামে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সেনারাও।
জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরের ৭০টি গ্রামে ১২৬টি সহিংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে পুড়ে গেছে চার হাজারেরও বেশি জলপাই গাছ, যা ফিলিস্তিনিদের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল।
বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও উদ্বেগ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠন গাজার চলমান এই আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, “যুদ্ধবিরতি মানে শান্তি প্রতিষ্ঠা, কিন্তু গাজায় এখনো রক্তপাত চলছে এটি অগ্রহণযোগ্য।”
তবে আন্তর্জাতিক চাপের পরও ইসরাইল এখনো হামলা বন্ধ করেনি। বরং দাবি করছে, তারা ‘নিরাপত্তা হুমকি’ মোকাবিলায় অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তি শুধু আগ্রাসন বৈধ করার অজুহাত।
গাজার মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই
অবরুদ্ধ গাজার মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বেঁচে থাকা। খাদ্য, পানি, ওষুধ সব কিছুর তীব্র সংকট। অনেকে ধ্বংসস্তূপে আটকে আছে, কেউ আবার আশ্রয় নিয়েছে অস্থায়ী ক্যাম্পে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার অন্তত ১৭ লাখ মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত। তাদের বেশিরভাগই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মরিয়া হয়ে আছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এখনই যদি টেকসই যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হয়, তবে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে।
গাজায় যুদ্ধবিরতির পরও হামলা অব্যাহত রাখায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হচ্ছে। মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, আহত ও নিখোঁজ মানুষের খোঁজ মিলছে না। বিশ্ববাসী যখন শান্তির আহ্বান জানাচ্ছে, তখন গাজার আকাশে এখনো ধোঁয়া আর আগুনের রেখা। মানবতার ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে এক ভয়াল অধ্যায় হয়ে থাকবে।








